তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য ভূমিকা পালনকারী আলোকিত একজন মানুষ। রাজনীতিতে তিনি মেধা, শ্রম, সততা, গণমনস্কতা এবং আদর্শবাদের প্রতীক। যিনি এই দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসায় নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে গেছেন প্রতিনিয়ত, যার সর্বোত্কৃষ্ট প্রমাণ মেলে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অসাধারণ গৌরবদীপ্ত ভূমিকা পালন এবং বিজয় অর্জনের সাফল্য। তাজউদ্দীন আহমদ বহুল অংশেই ছিলেন প্রচার বিমুখ কর্মযোগী মানুষ। নিজেকে খুব যত্নের সঙ্গে আড়াল করে রাখার অসাধারণ প্রচেষ্টা ছিল তার। তার সহকর্মী বন্ধু সুহূদয়দের লেখা, সাক্ষাত্কার থেকে জানা যায়, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বলতেন, “আসুন এমনভাবে আমরা কাজ করি যেন পরবর্তিতে যখন ঐতিহাসিকরা বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করবে, তখন আমাদের খুজে পেতে কষ্ট হয়”। জীবন এবং মৃত্যুতে মহীয়ান স্বাধীনতা ও ত্যাগে গৌরবপৃষ্ঠ মানবিক উদার এবং স্বচ্ছদৃষ্টির অধিকারী শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দ্বারা প্রাণিত তাজউদ্দিন আহমদের জীবন যে কোন মানদন্ডে তাত্পর্যপূর্ণ। তাজউদ্দীন আহমদের ৮৮ তম জন্ম দিন ছিলো গত ২৩ জুলাই। সেই উপলক্ষ্যে তাঁর বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যের ছোট ছোট অংশ নিয়ে তাঁকেই শ্রদ্ধা নিবেদন করা হলো ।
স্বাধীনতা মন্ত্রের উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাজউদ্দীন আহমদের ভালোবাসা ও অনুগত্য কিংবদন্ত্মীর মতো। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের দ্বারপ্রান্ত্মে ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দেয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অফিস ঘর দেশী-বিদেশী গণমাধ্যম কর্মীদের ভিরে মুখরিত, সবাই ঘিরে ধরেছেন তাকে। মুহর্মুহ জ্বলে উঠেছে ক্যামেরার ফ্লাশ লাইট। প্রশ্ন একটি-ই- প্রধানমন্ত্রীর অনুভূতি কী? প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি। বললেন আপনারা আমার অনুভূতি জানতে এসেছেন? আমিতো দাই-এর কাজ করছি মাত্র। বাংলাদেশ নামে যে শিশুর জন্ম হলো আজ আমি তাঁর পিতাকে জন্ম সংবাদ জানাতে পারিনি।
“বাংলাদেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্য রচিত হোক এক নতুন পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক ক্ষুধা, রোগ, বেকারত্ব আর অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। এই পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত হোক সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ভাইবোনের সম্মিলিত মনোবল ও অসীম শক্তি। যাঁরা আজ রক্ত দিয়ে স্বাধীন উর্বর করেছে বাংলাদেশের মাটি, যেখানে উত্কর্ষিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ, তাদের রক্ত ঘামে ভেজা মাটি থেকে গড়ে উঠুক নতুন গনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা; গণ-মানুষের কল্যাণে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তি প্রসত্মরে লেখা হোক ‘জয় বাংলা’ জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।”
“রাজনীতিতে সহনশীলতার প্রয়োজন সমধিক। পরষ্পরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা স্বাধীন দেশের নাগরিকদের অন্যতম দায়িত্ব।
“গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের অসাবধানতাবশত দোষত্রম্নটি তুলে ধরতে হবে। শুধু বিরোধিতার খাতিরে কোন দল অথবা ব্যক্তি বিশেষের সরকারকে সমালোচনা অথবা দোষারোপ করা উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখে দল অথবা ব্যক্তি বিশেষের সমালোচনা গঠনমূলক হওয়া উচিত।” “গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে সহনশীলতা। এর অভাবে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোরই ক্ষতি হবে না, খোদ রাষ্ট্রের স্বার্থেও বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির পথ পরিহার করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী এই উভয়পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতার অনুশীলন শিক্ষার প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে ঊর্ধে রেখে পারষ্পরিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেশের সত্যিকার সমস্যা তুলে ধরবেন এবং সমাধানের ইঙ্গিত প্রদর্শন করবেন, এটাই কামনা করি। অন্ধভাবে আমাদের শুধু প্রশংসা করলেই চলবে না।” নিজের ঘর থেকেই দুর্নীতির বিরম্নদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি জীবনে পুর্বাপর সংহতি বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতির উচ্ছেদ হবে না এবং বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি কখনো যাবে না। ওপর থেকে আদর্শ -অনুশাসন করে দেখাতে হবে। তাহলে কর্মীরা উত্সাহ ও প্রেরণা পাবে। ওপরে বসে দুর্নীতি করে আদর্শবান নাগরিক হবার উপদেশ প্রদান করা উপহাসমাত্র। এতে জাতির দুর্ভোগ বাড়বে বই কমবে না।” দুষকৃতকারীর একমাত্র পরিচয় সে দুষকৃতকারী। সে যে দলেরই হোক। আমরা অনেক সময় এটা বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেই। এতে দুটো সর্বনাশ হয়। সে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যায়। রাজনৈতিক শেস্নাগান তার পক্ষে যাবার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়, এবং সে যতটা শক্তিশালী নয় কিন্তু জনগণের সামনে শক্তিশালী প্রমাণ হয়।”
“আমি ১৯৭১সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনায় যে সব সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছিলাম তা বাংলাদেশ ও এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বার্থেই নিয়েছিলাম। বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা আর বাঁচা- মরার প্রশ্নকে সেদিন সবচেয়ে উচুতে স্থান দিয়েই আমি কাজ করে গিয়েছি। আওয়ামী লীগের একজন কনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে এবং একজন খাঁটি বাঙালি হিসাবে আমার দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করতে পারায় আমি খুশি।” “দুই যুগেরও বেশি সময় আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে এবং এ দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে সমবেত হয়ে যে সংগ্রামে শরিক হয়েছে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফল করে দেশ স্বাধীন করেছে। তাই বাংলার মানুষ ভালোবেসে তাঁকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু খেতাব দিয়েছে্ কাজেই বঙ্গবন্ধুর বিরোদ্ধে কটুক্তি করার এখতিয়ার কারোরই নেই।”
লেখকঃ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা ও গাজীপুর-৪ কাপাসিয়া আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য।
