নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা\ সততা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও কঠোর অধ্যবসায়কে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্যতাকে হার মানিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে আশাতিত সাফল্য অর্জন করার পরেও সিরাজুল, সুজনা আক্তার, আমিনুল ইসলাম ও নয়ন মিয়ার ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ উঁকিঝুঁকি মারছে। শুধু অর্থাভাবে স্বপ্নিল ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত তারা। এরা ঠেলাগাড়ি চালক, রিকশাচালক ও দিনমজুরের মেধাবী সন্তান। নিজেরাও রিকশা, ঠেলাগাড়ি চালিয়ে, দিনমজুরি, রাজমিস্ত্রীর জোগালি ও অন্যের কাপড় সেলাই করে পড়ালেখার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করে। তাদের পক্ষে উচ্চশিক্ষা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সঙ্কট।
সিরাজুল ইসলাম
অভাবের সংসারে বড় হওয়া, পড়ালেখা করা। সময় পেলে বাবার হাত থেকে ঠেলাগাড়ি নিয়ে নিজে চালিয়ে পরিবার ও বাবাকে সাহায্য করা। টিউশনি পড়ার সামর্থ্য না থাকায় রাত জেগে ক্লাসের পড়া তৈরি করা, পৌর এলাকার পূর্ব সুখাতি গ্রামের দরিদ্র জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে সিরাজুল ইসলামের নিত্যদিনের রুটিন। নিজের চেষ্টা, ক্লান্তিহীন পরিশ্রম ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে এবারে নাগেশ্বরী ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ায় বাবা আবেগ আপ্লুত হলেও অজানা আশংকায় ভুগছেন তিনি। সন্তানের পড়ালেখার আগ্রহ অর্থাভাবে ব্যর্থ হবে সে কষ্টই সারাক্ষণ কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে ।
সুজনা আক্তার
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার পরে অর্থাভাবে সহায়ক বই, টিউশনি পড়তে না পারায় মাধ্যমিকে কিছুটা খারাপ ফলাফলে মনোবল ভেঙ্গে যায় ভিতরবন্দ সরকার পাড়া গ্রামের দিনমজুর বাবা সলিম উদ্দিনের মেয়ে সুজনা আক্তারের। ঘরে একা বসে কেদেছে। বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে। বাবা সলিম উদ্দিন ও মা ফাতেমা বেগমের অনুপ্রেরণায় নতুন উদ্যোমে পড়ালেখা করে এবারে ভিতরবন্দ মহাবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে সে প্রমাণ করেছে চেষ্টা থাকলে সবই সম্ভব। কিন্তু নিজে অন্যের কাপড় সেলাই করে পড়ালেখার খরচ চালানোর পাশাপাশি এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হলেও উচ্চশিক্ষা নিতে শংকিত তার পুরো পরিবার।
আমিনুল ইসলাম
উপজেলার হাসনাবাদ বেতবাড়ি গ্রামের রিকশা চালক মোস্তফা আলীর আয়ে চলে ৫ সদস্যের পরিবার। আমিনুল ইসলাম বাবার বড় ছেলে। নেওয়াশী মহাবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের আগেই ঢাকায় গিয়ে বাবার সাথে রিকশা চালাতে শুরু করে। যাত্রী নামিয়ে ভাড়া নেয়ার সময় তার এক বন্ধু মুঠোফোনে জানায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আনন্দাশ্রু পড়ে কপোল বেয়ে। বস্তিতে ফিরে বাবাকে এ সুসংবাদ জানালে তাত্ক্ষণিক আনন্দিত হলেও কিছুক্ষণ পরেই বিষণ্নতা গ্রাস করে তাকে। বলে বাবারে মন চায় তুই অনেক বড় হবি কিন্তু সামর্থ্য কোথায়।
নয়ন মিয়া
নাগেশ্বরী পৌর এলাকার মন্দিরের খামারের দিনমজুর আফছার আলীর ছেলে নয়ন মিয়া শ্রম বিক্রি করে পড়ালেখা চালায়। দীর্ঘদিন কলেজ বন্ধ থাকলে সে ঢাকায় গিয়ে রাজমিস্ত্রির সহযোগীর কাজ করে। নাগেশ্বরী টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট থেকে কারিগরি শাখায় জিপিএ-৫ পাওয়ায় সে, তার পরিবার ও প্রতিবেশিরা উচ্ছ্বসিত। সবাই চায় সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নয়ন এগিয়ে যাক অনেকদূর। নিরন্তর অভাব ও দারিদ্র্যতায় তা কতটুকু সম্ভব এটাই তাকে ভাবাচ্ছে।
