বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন হোসেন আর নেই। গতকাল বুধবার ভোর ৫টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। বিচারপতি কামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। কামাল উদ্দিন হোসেন ১৯৭৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮২ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর সামরিক সরকার তাকে বেআইনিভাবে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করে।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী, আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি, জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এদিকে গতকাল বাদ জোহর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মরহুমের প্রথম ও বাদ আছর গুলশানের আজাদ মসজিদে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। আগামী শুক্রবার নিজ বাসভবনে (গুলশান-২ এর ৭৪ নম্বর রোডের ৭-বি নম্বর বাসায়) বাদ মাগরীব মরহুমের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত প্রথম জানাজায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদুল হক, বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, বিচারপতি এমআর হাসান, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি একেএম জহিরুল হক, বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেন, বিচারপতি শাহিনূর ইসলাম ছাড়াও সাবেক প্রধান বিচারপতি এমএম রুহুল আমিন, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি খোন্দকার মূসা খালেদ, এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাবেক এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এমপি, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা জানাজায় অংশ নেন। জানাজায় অংশ নেয়া সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে মরহুমের বড় ছেলে ড. এজাজ হোসেন বলেন, আপনাদের অনেকেই আমার পিতার সঙ্গে কাজ করেছেন। অনেকেই তার পরিচিত ছিলেন। তিনি যদি কাউকে কোন কষ্ট দিয়ে থাকেন তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এ সময় মরহুমের আরেক পুত্র ইশতিয়াক হোসেন উপস্থিত ছিলেন। আরেক পুত্র ফাইয়াজ হোসেন আমেরিকায় থাকেন।
প্রথম জানাজা শেষে দুপুর আড়াইটার দিকে মরহুমের লাশ গুলশানের আজাদ মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাদ আছর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শোক প্রকাশ রাষ্ট্রপতি
বিচারপতি কামাল উদ্দিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট এক বাণীতে বলেন, তার মৃত্যুতে জাতি একজন গুণী ব্যক্তিকে হারাল।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারপতি হোসেনের অবদান স্মরণযোগ্য। রাষ্ট্রপতি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তার মৃত্যুতে জাতি একজন সত্ ও দেশপ্রেমিককে হারিয়েছে। শেখ হাসিনা মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগ আরো সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিচারপতি হোসেনের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
স্পিকার
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোক বাণীতে তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
শোক বাণীতে স্পিকার বলেন, কামাল উদ্দিন হোসেন একজন অসাধারণ মেধাসম্পন্ন বিচারপতি ছিলেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তার অবদান বাঙালি জাতি আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তার অবদান মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মোঃ কামরুল ইসলাম এমপি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের মৃত্যু দেশের আইন ও বিচারাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান।
জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেন, কামাল উদ্দিন হোসেন প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে সততা ও ন্যায় বিচারের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা আমাদের বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে গভীর শ্রদ্ধাভরে চীরকাল স্মরণ করবে।
জীবন বৃত্তান্ত
বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন ১৯২৩ সালের ৩১ মার্চ দক্ষিণ কলকাতার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রফিক উদ্দিন হোসেন কলকাতা করপোরেশনের কমিশনার এবং মাতা রাবেয়া খাতুন একজন গৃহিনী ছিলেন। কামাল উদ্দিন হোসেন ১৯৪০ সালে কলকাতার বালিগঞ্জ সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর সেন্ট জেভিয়ার কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে বিএ ডিগ্রী এবং কলকাতা ইউনির্ভাসিটি ল কলেজ থেকে ১৯৪৯ সালে এলএলবি ডিগ্রী লাভ করেন। এলএলবি ডিগ্রী লাভের পর তিনি কলকাতা হাইকোর্ট বারে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। একজন মুসলিম হিসেবে আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তাকে সম্মানজনক ‘স্যার রাসবিহারী মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল’ প্রদান করা হয়। এরপর ভারতে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা দেখা দিলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি ঢাকায় আসেন একজন শরণার্থী হিসেবে এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি সুলতানা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সুলতানা বেগম ছিলেন অল ইন্ডিয়া টি প্লানটার’স এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জলপাইগুড়ির বাসিন্দা মরহুম ইনামুল হোসেনের কন্যা।
বিচারপতি কামাল উদ্দিন ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। ওই বছরই তিনি হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয় সরকার। আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৯৭৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি তাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এরপর শপথ নিয়ে তিনি ১৯৮২ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি ছিলেন। কিন্তু তত্কালীন সামরিক সরকার তাকে বেআইনিভাবে সামরিক ফরমান বলে বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করে। এরপর থেকে তিনি আইনের শাসন, গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করে গেছেন। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি দক্ষতার সঙ্গে ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
বিচারপতি কামাল উদ্দিন আজীবন উত্সাহী পাঠক ছিলেন। ইতিহাস ও সাহিত্যে ছিলো তার বিশেষ আগ্রহ। চাকরি জীবন থেকে অবসরের পর তিনি আনন্দের সঙ্গে লেখালেখি করে গেছেন। তিনি বাংলা ভাষায় চারটি বই লিখেছেন। এগুলো হচ্ছে, ১. মহান মোগল (দ্যা গ্রেট মোগল) ২. বিশ্ব সভ্যতা পরিক্রমা ও বাংলাদেশ ৩. রবীন্দ্রনাথ ও মোগল সংস্কৃতি ৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ ও মোগল সংস্কৃতি নামক বইটির জন্য ১৯৯৮ সালে কামাল উদ্দিন আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন। বিভিন্ন পুরস্কারের যাবতীয় অর্থ তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করেছেন।
আইনের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন তিনি ঃ
বিচারপতি খায়রুল হক
মৃত্যুর পর বিচারপতি কামাল উদ্দিনকে মূল্যায়ন করেছেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। গতকাল মরহুমের জানাযার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে আমি বিচারপতি কামাল উদ্দিনকে চিনি। ওই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য বিচারপতি ছিলেন। আইন অঙ্গনের ছিলেন একজন মহীরুহ। বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, সামরিক সরকারের আমলে মার্শাল ল রেগুলেশনের প্রথম ভিকটিম ছিলেন তিনি। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে বেআইনি ও অবৈধভাবে বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তিনি বলেন, বিচারপতি কামাল উদ্দিন ছিলেন আইনের একজন একনিষ্ঠ সাধক। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। হিন্দু ল’র উপর তার কাজ ছিলো অসাধারণ। তাকে আমরা অনেক ভয় পেতাম এবং শ্রদ্ধা করতাম। আইন অঙ্গনের সকলেই তার নাম চীরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবেন।
