রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরূপ মনোভাব থাকলেও সংবিধান মেনেই আগামী দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন আয়োজনের কোন সুযোগ নেই। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের উপ-ধারা (৪) এ নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।’ ফলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে দলীয় সরকারের অধীনে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ও মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘কোন দল বা জোটের প্রেসক্রিপশন নয়, সংবিধান নির্বাচন আয়োজনের যে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।’
এদিকে সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। নির্বাচন কমিশনকে দলীয় আজ্ঞাবহ বলেও প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে যাচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে আসছে। এই দুই দল বা তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের পরস্পর বিরোধী অবস্থানে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তবে সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় আনতে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘নানা বাস্তবতার কারণে আমাদের দু’ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংসদে একসঙ্গে বসে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারেন বলে তিনি মত দেন।’
এ বিষয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সংকটের সমাধান হতে পারে। এ জন্য বিকল্প চিন্তা মাথায় রাখা হয়েছে। তাছাড়া সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থানে রেফারির ভূমিকায়ও থাকার সুযোগ নেই কমিশনের।
সংবিধানের ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট করা হয়েছে। ১১৮ অনুচ্ছেদের উপ-ধারা (৫)-এ বলা আছে, ‘সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে’। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের উপ-ধারা (১)-এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকিবে।’ উপ-ধারা (২)-এ উল্লেখ আছে, ‘নির্ধারিত দায়িত্বসমূহের অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এই সংবিধান বা অন্য কোন আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে, নির্বাচন কমিশন সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন।’
জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের উপ-ধারা (৩)-এ বলা আছে, ‘সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে’। উপ-ধারা (ক) এ বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নববই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে:তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না। (৪) সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদের কোন সদস্যপদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত শূন্যপদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, কোন দৈব-দূর্বিপাকের কারণে এই দফার নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয়, তাহা হইলে উক্ত মেয়াদের শেষ দিনের পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে উক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। সংবিধানের ১২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ, ভোটার-তালিকা প্রস্তুতকরণ, নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সংসদের যথাযথ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়সহ সংসদের নির্বাচন সংক্রান্ত বা নির্বাচনের সহিত সম্পর্কিত সকল বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করিতে পারিবেন।’ ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়ে ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। বিরোধী দল থেকে যেসব দাবি তোলা হচ্ছে তা রাজনৈতিক। সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তিনি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, তখনও বলা হয়েছিল সংবিধান অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি নির্বাচন করা ছাড়া কোন উপায় নেই। পরে অবশ্য অন্য বাস্তবতায় সেই নির্বাচন হয়নি।
