দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে সেই প্রশ্নের এখনো সুরাহা হয়নি। আগামীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুনরায় সহিংস হয়ে উঠার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ চিন্তিত। কিন্তু তাই বলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঘরে বসে নেই। তারা বিভিন্নভাবে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে পুরো রমজান মাস জুড়েই জেলার সর্বত্র ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জনসংযোগ করেছেন।
অনেক প্রার্থী রঙ্গিন পোস্টার ব্যানার দিয়ে জনসাধারণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনেকে ধর্মীয়, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনুদান প্রদান করছেন। জেলায় চা বাগান ও ভাটি এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্র্রদায় কেন্দ্রিক ভোট ব্যাংকের উপর আওয়ামী লীগ অনেকটাই নির্ভরশীল। ইদানিং ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় এখানকার বিএনপি নেতা-কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করেছে। তারা মনে করেন, জাতীয় রাজনীতির প্রভাবে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে জাতীয় পার্টি হবিগঞ্জ-২ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনে ২ জন শক্তিশালী প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমে বড় দুই দলের প্রার্থীদের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়াই করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে হবিগঞ্জে জাতীয় সংসদের ৪টি আসনের মধ্যে ৩টিতে আওয়ামী লীগ ও ১টিতে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্যা হচ্ছেন বিএনপি দলীয় শাম্মী আক্তার শিপা।
জেলায় ৪টি নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৯১৬। তন্মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ লাখ ২০ হাজার ৬৮৪ এবং মহিলা ভোটার ৬ লাখ ৩৪ হাজার ২৩২। বিগত সংসদ নির্বাচনে ৮ উপজেলার ৭৭টি ইউনিয়ন ও ৬টি পৌরসভায় ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৬২৪ এবং ভোটকক্ষের সংখ্যা ছিল ২৩১৩টি।
হবিগঞ্জ-১ ঃ নবীগঞ্জের ১৩টি ও বাহুবল উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৪ হাজার ৯। তন্মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৫৭ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৫২ জন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য বিএনপি দলীয় শেখ সুজাত মিয়া। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া বিজয়ী হন। ইংল্যান্ড প্রবাসী শেখ সুজাত মিয়া দলকে সুসংহত করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত অনুদানও দিয়েছেন প্রচুর পরিমাণে। এখানে আগামী নির্বাচনে বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে তাকেই বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়াও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন ইংল্যান্ড প্রবাসী অধ্যাপক আব্দুল হান্নান। আওয়ামী লীগ দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন হবিগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা বিএমএ সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী। এছাড়াও আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন আমেরিকা প্রবাসী সাবেক এমপি এডভোকেট আব্দুল মোছাব্বির, প্রয়াত এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজীর পুত্র শাহনেওয়াজ গাজী, অধুনালুপ্ত ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক কানাডা প্রবাসী মেজর (অব.) সুরঞ্জন দাশ, বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট মো. আবুল ফজল। জাপা দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী আব্দুল মুনিম চৌধুরী বাবু, আব্দুল হামিদ চৌধুরী ও এডভোকেট মুফতি আব্দুর রহমান চৌধুরী। খেলাফত মজলিশের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মওলানা আব্দুল কাইয়ুম জাকিও প্রার্থী হতে পারেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়ার পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া কোন বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে চমক দেখাতে পারেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
হবিগঞ্জ-২ঃ বানিয়াচং-এর ১৫টি ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৪ জন। তন্মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৩২ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬১২ জন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আব্দুল মজিদ খান। এছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার, সাবেক এমপি এডভোকেট শরীফউদ্দিন আহমেদের পুত্র আমেরিকা প্রবাসী মিনহাজউদ্দিন শরীফ রাসেল, শিল্পপতি আমজাদ হোসেন ফনিক্স। এ আসনে বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন। এছাড়া দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চল বিএনপি সভাপতি আহমদ আলী মকিম ও বানিয়াচং উপজেলা বিএনপি সভাপতি এডভোকেট মনজুরউদ্দিন আহমেদ শাহীন। খেলাফত মজলিশের জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদেরও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমির মওলানা আব্দুর রব ইউসুফিও প্রার্থী হতে পারেন। জাপা’র সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন জেলা জাপা’র সম্পাদক শিল্পপতি শংকর পাল। তিনিও এলাকায় জনসংযোগ করছেন। এছাড়া এডভোকেট আবিদ আলী চৌধুরীও দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন।
হবিগঞ্জ-৩ ঃ হবিগঞ্জ সদরের ১০টি ও লাখাই উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮২৫। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৫ হাজার ১০৩ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭২২ জন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি এডভোকেট মো. আবু জাহির। তিনি দিনরাত জনসংযোগ করে চলেছেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও তার ভূমিকা লক্ষণীয়। সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শহীদউদ্দিন চৌধুরীও আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন জেলা বিএনপির সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব জি.কে গউছ। এ আসনে বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরী আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ডা. আহমদুর রহমান আবদালও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হচ্ছেন জেলা জাপা সভাপতি আলহাজ্ব আতিকুর রহমান আতিক। তিনি গত ২ বছর যাবত্ জনসংযোগ ও নির্বাচনী এলাকার ধর্মীয়, শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছেন। খেলাফত মজলিশের মনোনয়ন চাইতে পারেন এডভোকেট সারোয়ার রহমান চৌধুরী শামীম। এ আসনে সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমুদুল হকও জনসংযোগ শুরু করেছেন। তিনি বড় কোন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে চমক দেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ-৪ ঃ চুনারুঘাটের ১০টি ও মাধবপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৮ জন। তন্মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৫৯২ এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪৬। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হচ্ছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। তিনি বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পিছনে নির্বাচনী এলাকার ১৭টি চা বাগানের সংখ্যালঘু শ্রমিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনিও জনসংযোগ শুরু করেছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন সাবেক এমপি মাওলানা আসাদ আলীর পুত্র হাইকোর্টের এডভোকেট মাহবুব আলী, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম, শিল্পপতি সৈয়দ মো. তানভীর ও আরিফুল হাই রাজিব। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন জেলা বিএনপি সভাপতি শিল্পপতি আলহাজ্ব সৈয়দ মো. ফয়সল। দীর্ঘদিন যাবত্ তিনি জেলায় বিএনপিকে সুসংহত করার ব্যাপারে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ আসনে খেলাফত মজলিশের প্রার্থী হতে পারেন কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের কিংবা জেলা সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল করিম। জাপা’র মনোনয়ন চাইতে পারেন ইংল্যান্ড প্রবাসী কাওসারুল গণি।
