কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা জটিলতা

অনুমোদনের অপেক্ষায় এটিএম বুথ স্থাপনের শত শত আবেদন

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৬
এটিএম বুথ স্থাপন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সময়ক্ষেপণ থেকে শুরু করে অনিয়মের সুযোগও তৈরি হয়েছে এক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। অনেকেই এই নির্দেশনাকে গ্রিন ব্যাংকিং অর্থাত্ পরিবেশ বান্ধব (কাগজ সাশ্রয়ী) ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিপন্থি বলে সমালোচনা করেছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় বুথ স্থাপনের শত শত অনুমোদন প্রস্তাব আটকে আছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দেশনা জারির পর থেকে এটিএম বুথ স্থাপনে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হয়। আগে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নির্দেশনায় তাদের অনুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুমোদনের আবেদন করে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনুমোদন মেলে না। যে কারণে চলতি বছরে এটিএম বুথ স্থাপনের পরিমাণ কমে গেছে। এতে গ্রাহকরা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য এখন কমবেশি দেড়শ’ বর্গফুট জায়গার ভাড়া কত হবে সেটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। অবস্থান, ভাড়ার হার, মেশিন, ভবনের মালিক প্রভৃতি তথ্যও জানাতে বলা হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এসব তথ্য জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করলে সেখানে কয়েক মাস ফাইল চাপা পড়ে থাকে। সেখান থেকে এসব গোপনীয় তথ্যও ফাঁস হয়ে যায়। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভাল অবস্থানের কারণে আবেদন করা নির্ধারিত বুথ আরো বেশি টাকায় ভাড়া নিতে ভবন মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে বুথ ভাড়া নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতায় নামতে হয় আবেদনকারী ব্যাংককে। বেড়ে যায় ভাড়ার পরিমাণ। আবার নির্ধারিত বুথটির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া যাবে কি না, সেই ভয়ও থাকে। সূত্রমতে, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আস্থাই নেই। অথচ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ পান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের মাধ্যমেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেরাই এটিএম সুইচ কেনার প্রকল্প নিয়েছে। যদিও সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে ঢিমেতালে। অনেকেই বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে যা উচিত নয়। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্টে’ অধিক মনোযোগী হওয়াকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামস্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় তদারকিতেও ভাটা পড়েছে। ফলে, হলমার্কের মত ঘটনা ঘটছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংকই এটিএম বুথ পরিচালনা করে আসছে। কেউ সরাসরি, কেউ কিউ ক্যাশ নামক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগুলো পরিচালনা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার এটিএম বুথ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি এটিএম বুথ রয়েছে ডাচবাংলা ব্যাংকের। যার পরিমাণ আড়াই হাজারের মত। ইসলামী ব্যাংকের ২৯১টি, এবি ব্যাংকের এটিএম বুথ রয়েছে ২৩১টি। অগ্রণী ব্যাংকের ৬টি ও আলআরাফাহ ব্যাংকের রয়েছে ২৮টি। এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার ৮০টি, ব্র্যাক ব্যাংকের ৩২২টি, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ১৩টি, ঢাকা ব্যাংকের ৪২টি এটিএম বুথ রয়েছে। আরো রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৬৭টি, এক্সিম ব্যাংকের ২২টি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৪২টি, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ১০টি, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪৭টি, যমুনা ব্যাংকের ১শ’টি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১শ’টি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৫৬টি, এনসিসি ব্যাংকের ৪৭টি, ওয়ান ব্যাংকের ৩০টি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৬টি, প্রাইম ব্যাংকের ১৩৮টি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫টি, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৫৩টি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ৯৬টি, সিটি ব্যাংক ১৫৬টি, হংকং সাংহাই ব্যাংকের ৩৯টি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ১০৫টি এবং ইউসিবির ৯৬টি বুথ রয়েছে। নতুন করে ব্যাংকের এটিএম বুথ স্থাপন জটিলতার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কে এম আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, আগে শুধু জায়গার অনুমোদন নিয়েই ব্যাংকগুলো বুথ স্থাপন করতে পারত। তবে এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অন্যায়ের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিল। এজন্য এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন আইন অনুযায়ী কোন্ জায়গা, জায়গার পরিমাণ কতটুকু, কয়টা মেশিন বসবে এ ধরনের যাবতীয় তথ্য দেয়ার পর বুথ স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। তবে সময়ক্ষেপণ ও অন্যান্য জটিলতা নেই বলে তিনি জানান।