গণতন্ত্র রাজনীতি ও জনগণ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৩, ২২:১৫
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে রাজনীতিবিদদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার অভাবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে মনে করি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের অধিকারকে সুসংহত করা অপরিহার্য বা মৌলিক বিষয়। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরেও আমাদের রাজনীতিবিদদের গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেই শুধু চলবে না। গণতন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য এবং ঐ আসল জায়গাতেই এখন টানাপড়েন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে জনগণের ভাগ্য ও মৌলিক অধিকার নিয়ে একবার ভাবার অবকাশটুকুও থাকে না তাঁদের। তখন ব্যবধান হয়ে যায় রাজা এবং প্রজার মতো। রাজার দয়া-দাক্ষিণ্যের প্রতীক্ষায় থাকে জনগণ। যদি রাজাধিরাজের দয়া হয় তবেই কেবল প্রজাদের ভাগ্যের উন্নয়ন তথা দেশের উন্নয়ন। আমরা জানি কেবল প্রজাতন্ত্রেই এই রীতিনীতি চালু আছে। তবে কেন আমাদের গণতন্ত্রে এই ধারা চালু হলো? এক সময় নবাবি আমলে প্রজাতন্ত্রে চালু ছিল রাজা এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরাই মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন অন্য কেউ নয়। কিন্তু আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ উন্নতি লাভ করার পরেও আমাদের ভাগ্য গণতন্ত্রের নামে প্রজাতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। একবার ভোটে বিজয়ী হয়ে মসনদে বসতে পারলেই হয়, তারপরেই শুরু হয়ে যায় রাজাধিরাজের প্রজাদের ওপর স্টিমরোলার চালানো। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এমপি, মন্ত্রী ও সংসদ চলে, তাদের বিলাসবহুল চলাফেরা আর জনগণের ওপর বরাদ্দ কেবল নতুন নতুন ট্যাক্সের বোঝা। জনগণকে জিম্মি করে ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণ আজ নিষ্পেশিত। আর অবৈধ উপায়ে টাকার প্রাসাদ গড়ার এই সংস্কৃতি থেকে কি আমরা কখনো পরিত্রাণ পাবো না? আমাদের গণতন্ত্রের পরিণতি ক্রমাগত হাল রাজনীতির রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গণতন্ত্রের কথা শুধু মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। আধুনিক গণতন্ত্রের প্রবর্তক আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, Basic democracy is by the people for the people of the people। আসলে People-এর স্থলে Party মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নেতা Party প্রধানের যত বেশি গুণকীর্তন করতে পারবেন তিনি শত দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও Party প্রধানের কাছ থেকে তিনিই দেশপ্রেমিক উপাধিতে ভূষিত হন। আজ একবিংশ শতকে যেখানে উন্নত দেশগুলো গণতন্ত্রের দিকে ক্রমাগত পা বাড়াচ্ছে সেখানে আমরা দুর্ভাগা জাতি গণতন্ত্র উত্তরণের পথে আমাদের দলগুলো এবং নেতা-নেত্রীরা তত বেশি পিছপা হয়ে পড়েছে। অথচ আজ জনগণের মূল অধিকারের জায়গাটি অর্থাত্ ভোটাধিকার যা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত সে জায়গাটাও অনিশ্চয়তার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত। সরকারি দল এই মুহূর্তে দেশের অভিভাবক, গণতন্ত্র সুসংহত রাখার দায়-দায়িত্ব তাদেরই ওপর বেশি। দেশের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব জনগণ তাদের ওপরেই দিয়েছে। তাই দায়িত্বশীল ভূমিকায় থেকে দেশের স্বার্থে গণতন্ত্রের স্বার্থে বেশি উদারতা, সমঝোতা, সহমর্মিতা ও পরমতসহিংষ্ণুতা সরকারি দলেরই বেশি দেখানো উচিত। সে বিষয়টাকে বিবেচনায় রেখে অন্তত গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ভোটের জায়গাটিকে সুসংহত করার লক্ষ্যে, জনগণের আস্থার জায়গাতে দাঁড় করানো সরকারে যাঁরা আছেন তাঁদেরই নৈতিক দায়িত্ব। ফরিদপুর