শিক্ষার প্রধান নিয়ামক হচ্ছেন শিক্ষক। যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে তাঁদের বেঁচে থাকার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে অনেক উচ্চশিক্ষিত মেধাবীর আগমন ঘটছে, কিন্তু যথাযথ মর্যাদা না পাওয়ায় অন্য কোনো চাকরি পেলেই চলে যায় তারা। পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলে অবশ্যই এমনটি হতো না। একজন প্রধানশিক্ষক ১৫ বছর চাকরির মেয়াদঅন্তে ২য় শ্রেণির বেতনস্কেল পেয়ে থাকেন। যথাযথ যোগ্যতা সাপেক্ষে তাঁকে যদি সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাতে সরকারের যেমন অতিরিক্ত আর্থিক বরাদ্দের প্রয়োজন পড়বে না উপরন্তু গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষক নতুন উদ্যমে কাজ করতে উত্সাহ বোধ করবে। পাশাপাশি ঐ শিক্ষকের পদে স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষক নিয়োগ করতে পারায় সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে।
যে কোনো পেশায় প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রচলিত সিইনএড প্রশিক্ষণের গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে প্রশিক্ষণে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে হবে। প্রচলিত ধারায় মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ অনুযায়ী শিখন পদ্ধতি ফলোআপ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে ইউআরসি হতে পারে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সবার অংশগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা অফিসার ইউআরসি-র মধ্যে সমন্বহীনতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদটিকে ক্যাডারভুক্ত করে তার একক কর্তৃত্বের মাধ্যমে ইউআরসি-র জনবল কাঠামো বড়িয়ে প্রশিক্ষণ ও ফলোআপ কার্যক্রম চালানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সদ্য জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপারগ হয়েই এ পেশায় এসেছেন। অন্যসব সরকারি শিক্ষকের সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বেতনভাতার দিক থেকে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। শিক্ষক ও শিক্ষকতা পেশার মান উন্নয়নে তাঁদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি ও বজায় রাখার স্বার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলভিত্তিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে বিদ্যালয় এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯ জন কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধী। বাংলাদেশে বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় ১৬ লাখ শিশু রয়েছে। এসব শিশুকে বাইরে রেখে শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাদেরকে শিক্ষার আওতায় এনে সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম ‘একীভূত শিক্ষা’ কে আরো যুগোপযোগী করার ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক তৈরিসহ উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শ্রেণিতে পাঠদান করেন শিক্ষকরা। সে ক্ষেত্রে পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন প্রশাসনের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রিত হলে তা হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অন্তরায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতেই ন্যস্ত থাকে। প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সরকারি খরচে নেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।
শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্য শুধু শিক্ষাক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি উন্নতকরণ নয়। পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রথম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক নিঃসন্দেহে হতে হবে ছবিসর্বস্ব। তাই ছবির আকার-আকৃতির দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া উচিত। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে একটি ডিজিটাল ছবিও ব্যবহার করা হয়নি। উপরন্তু এমন কিছু ছবি আছে যা শিক্ষকদের পক্ষেই বোধগম্য নয়।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা এবং ইংরেজি বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্নের যে কলেবর দেওয়া হয়েছে তা ভেবে দেখা দরকার। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা এবং ইংরেজি বিষয়ে মোট ১৬টি করে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে এবং সবগুলোর উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক। সময় ছিল মাত্র দুই ঘণ্টা। অতিসম্প্রতি বাড়িয়ে করা হয়েছে আড়াই ঘণ্টা। তবে সময় বৃদ্ধির চেয়ে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত প্রশ্নের কলেবর ছোট করার প্রয়োজন ছিল বেশি। তাছাড়া পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীর আত্মপরিচয় বা ফরম পূরণ নামক একটি প্রশ্ন দেওয়া আছে। যেখানে শিক্ষার্থীর পরিচয় লেখার কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি পরীক্ষার খাতায় কোনো অবস্থাতেই পরীক্ষার্থীর পরিচয় যেন না থাকে সেজন্য কোডিং পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয় । খাতায় যদি পরীক্ষার্থীর পরিচয় উল্লেখ থাকে সেখানে কোডিং পদ্ধতি অকার্যকর এবং স্বজনপ্রীতির যথেষ্ট সুযোগ থাকবে।
মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং এটাও স্বীকার্য যে, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থ অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা খাতে কম বিনিয়োগ করে প্রত্যাশিত ফলাফল প্রাপ্তির উদাহরণ নেই। প্রাপ্তির পাল্লা আরো ভারী করতে প্রতি উপজেলার জন্য মান ও সমতা ভিত্তিক সমন্বিত ও সামগ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনার জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম ও বাজেট তৈরি এবং ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
নেত্রকোনা
