জনশক্তি রপ্তানির নামে প্রতারণা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রতারণার মাধ্যমে সহজ-সরল মানুষের কষ্টের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। দেশে ও বিদেশে এই চক্রের প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ। ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হওয়াটা যেন দেশের একশ্রেণির মানুষের ললাট-লিখন হয়েই দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে প্রতারক চক্র থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
বিদেশে শ্রমিক প্রেরণের নামে প্রতারণার ঘটনা অহরহই ঘটছে। আদম বেপারি নামের একশ্রেণির প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এমনকি বিদেশ-বিভুঁইয়ে অসহায় অবস্থায় প্রাণ হারানোর ঘটনাও কম নয়। এ অকাম্য অবস্থার অবসানে সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন২০১৩-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইন ভঙ্গকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যা একটি ভালো সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। সে কারণেই প্রচুর লোক প্রতিবছর বিদেশে পাড়ি জমায়। কাজের সন্ধানে বিদেশে যাওয়া এই শ্রমিকদের অনেকে দক্ষ, অনেকে অদক্ষ। অনেকে আবার তেমন লেখাপড়া জানেন না। প্রতারক চক্র এই অদক্ষতা ও শিক্ষাগত দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এই সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করে বিদেশগামী শ্রমিকদের সঙ্গে। নানা ছুঁতোয় অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ঘটনা তো অহরহই ঘটে। পাশাপাশি এক কাজের কথা বলে শ্রমিকদের অন্য কাজ দেওয়া হয়। যে সুযোগ-সুবিধা ও বেতনের কথা বলা হয় বা চুক্তি হয়, সেখানেও প্রতারণার শিকার হতে হয় শ্রমিকদের।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ ১৯৭০ সাল থেকেই জনশক্তি রফতানি করছে। শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার। ১৯৮০ থেকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। লিবিয়া ও সুদানসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও তখন থেকেই জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। ১৯৯০ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রুনাই, মিসর ও মরিসাসসহ কয়েকটি নতুন বাজার সৃষ্টি হয়। নতুন সহস্রাব্দে ব্রিটেন, ইটালি ও জাপানসহ এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে জনশক্তির চাহিদা সৃষ্টি হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির বাজার উন্মুক্ত হয়েছে।
স্মর্তব্য, দেশে বহির্গমনসংক্রান্ত যে আইন আছে তা ১৯৮২ সালে প্রণীত। তিন দশকের ব্যবধানে আইনগুলোর কার্যক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। নতুন আইন এ ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা দূর করবে। গত এপ্রিল মাসে কিছু পর্যবেক্ষণসহ আইনটির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। সে পর্যবেক্ষণের আলোকেই সম্প্রতি আইনের খসড়াটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জনগণের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩ বিদেশগামী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রস্তাবিত আইনে বিদেশগামী শ্রমিকদের বেতনভাতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ন্যূনতম এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতারণামূলক বা অননুমোদিত বিজ্ঞাপন দিলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ন্যূনতম জরিমানা তিন লাখ টাকা, চাহিদাপত্র-ভিসা-ওয়ার্ক পারমিট ইত্যাদির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ন্যূনতম জরিমানা তিন লাখ টাকা, অবৈধভাবে বিদেশ পাঠালে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর বাইরে ছোটখাটো আইন অমান্যকারীদের জন্য রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান। এছাড়া আইন অমান্যজনিত কারণে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও স্থগিত করারও বিধান রয়েছে। বিদেশগামী শ্রমিকদের কল্যাণে আইন প্রণয়ন অবশ্যই একটি ইতিবাচক ঘটনা।
আদম বেপারিদের প্রতারণা বন্ধে সরকারের এ পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। তবে আইন প্রণয়নের চেয়েও তার বাস্তবায়ন অনেক বেশি জরুরি। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনের অভাব না থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার জন্য অপরাধের প্রতিকার তথা ন্যায়বিচার পাওয়াও দুষ্কর হয়ে ওঠে। আইনটি পাসের আগে এসব সীমাবদ্ধতা কীভাবে কটিয়ে ওঠা যায় সে সম্পর্কে ভাবা হবে— জনগণ এমনটিই আশা করে।
ঢাকা
