নতুন জঙ্গি সংগঠন বিইএম। ঢাকাসহ সারাদেশে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে এই জঙ্গি সংগঠন। তারা ভারি অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ গড়ে তুলেছে। তাদের সংগঠন ‘সেনাবাহিনীর মতই’ কয়েকটি ভাগে গড়ে তোলা হয়েছে। রণকৌশল, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি ট্যাকটিক্স, ইন্টারোগেশন সেল ও প্লাটুন লিডারশিপ নামে কয়েকটি ভাগে প্রশিক্ষণ দেয় এই সংগঠন।
অস্ত্র ব্যবহারের কৌশলের পাশাপাশি ঐসব ভারি অস্ত্র কিভাবে তৈরি করা হয় তাও এই সংগঠনের ইনফ্যান্ট্রি ট্যাকটিক্স শাখা প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সংগঠনের একটি ইন্টারোগেশন সেল রয়েছে, যেখানে নতুন সদস্যদের ‘সামরিক কৌশল’ শেখানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকালে বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার একটি মেসে অভিযান চালিয়ে র্যাব এই সংগঠনের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে অত্যাধুনিক একে ২২ রাইফেল, একটি জার্মান এসএমজি, আমেরিকান পিস্তল, ৮০ রাউন্ড গুলি, ৬০টি বিদেশি চাকু, গুলির বাক্স, দুটি একে-৪৭ রাইফেলের বেয়োনেট, বিপুল পরিমাণ দেশি ধারালো অস্ত্র, তাদের সংগঠনের কাগজপত্র ও বিপুল পরিমাণ জিহাদী বই। গ্রেফতারকৃতরা হলেন ফিরোজ আলম (৩৫), নাহিদ (২২) ও বারহা শেখ বাবু (২১)। এদের মধ্যে ফিরোজ আলম দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জের একটি মাদ্রাসার শিক্ষক।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে র্যাব-১২ বগুড়া ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারকৃতদের হাজির করা হয়। র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, বিইএম নামে এই জঙ্গি সংগঠনটির প্রকৃত নাম এখনও র্যাব উদ্ধার করতে পারেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি’র আদলেই এই সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়েছে। এই সংগঠনটির ‘সামরিক কলাকৌশল’ দেখে র্যাবও বিস্মিত হয়েছে।
বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়ার জবানি সরকারি প্রাথমিক স্কুল লেনে দুলালের মালিকানাধীন এই মেসে গ্রেফতারকৃতরা চলতি মাসের শুরুতে ওঠেন। তিন কক্ষের ঐ মেসে বাইরে থেকে লোকজনের আসা-যাওয়া দেখে এলাকার বাসিন্দাদের সন্দেহ হয়। তারাই র্যাবকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়। এরকম তথ্যের ভিত্তিতে আরো তথ্য সংগ্রহের জন্য বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার দিকে র্যাবের স্কোয়াড্রন লিডার মীরান আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। মেসের প্রথম কক্ষে প্রবেশের পর র্যাব দ্বিতীয় কক্ষে বেশ কয়েকজনের উপস্থিতি আঁচ করতে পারে। দ্বিতীয় কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পায় সেখানে ১৪/১৫ জন গোল হয়ে বসে আছেন। একজন মাঝখানে বসে তাদের তালিম দিচ্ছেন। এ অবস্থায় গোল হয়ে বসে থাকা কয়েকজন র্যাব সদস্যদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কয়েকজন র্যাব সদস্যদের কিল, ঘুষি ও কামড় দেয়। এর মধ্যে একজন অন্য দরোজা দিয়ে তৃতীয় কক্ষে যায়। সেখান থেকে একটি কালো ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। র্যাবের এক সদস্যের সাথে ঐ ব্যক্তির ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ঐ কক্ষে জানালার গ্রিল খুলে অন্যরা পালাতে থাকে। উপস্থিত র্যাব সদস্যরা কালো ব্যাগ বহনকারী ব্যক্তিসহ ৩ জনকে আটক করে। ঐ ব্যাগ খুলে সেখান থেকে এসব ভারি অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে।
গ্রেফতারকৃত ফিরোজ আলম সাংবাদিকদের সামনে কোন মন্তব্য করেননি। অপর গ্রেফতারকৃত নাহিদ জানিয়েছেন, ঢাকার কমলাপুরে তার বাড়ি। শিবু নামে এক ব্যক্তি ৫ দিন আগে তাকে বগুড়ায় নিয়ে আসে। ঐ মেসে তাকে বাজার করার দায়িত্ব দেয়। মাঝে-মধ্যে মেসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সে অংশ নিয়েছিল। তবে বৈঠকে যেসব কৌশল সম্পর্কে জানানো হয়, তা তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। বারহা শেখ বাবু দাবি করেছেন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি তাকে সেখানে নিয়ে আসে বিভিন্ন দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। এজন্য তাকে টাকাও দেয়া হবে বলে জানায়। তবে যে ব্যক্তি তাকে ঐ মেসে এনেছিলেন, তাকে তিনি আর দেখেননি।
র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, গ্রেফতারকৃতরা এতটাই দক্ষ যে তাদের কাছ থেকে র্যাব কোন তথ্য বের করতে পারেনি। তারা নতুন এ জঙ্গি সংগঠনের ব্যাপারে এখনও মুখ খোলেনি। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা কাগজপত্র পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই জঙ্গি সংগঠনটির বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা এই নাশকতা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একে-২২ রাইফেল, এসএমজি’র মত ভারি অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করেছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে কোন জঙ্গি সংগঠনের কাছ থেকে এ ধরনের ভারি অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম। র্যাব-১২ অধিনায়ক এডিশনাল ডিআইজি জামিল আহমেদ জানান, জেএমবি’র শুরা কমিটির সদস্য সিদ্দিকুল ইসলাম ‘বাংলা ভাইয়ে’র বাড়ি ছিল বগুড়ার গাবতলীতে। বগুড়াতে জেএমবি’র একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। ঐ জেএমবি’র ‘নিষ্ক্রিয় সদস্যরা’ই হয়তো বিইএম গঠন করেছে। নাশকতার জন্য দলটি সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের কাছে পাওয়া বইয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ‘রীতিমতো সামরিক প্রশিক্ষণের’ কথা আছে।
মেস থেকে সাংকেতিক ভাষায় লেখা বেশকিছু কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ইল্ম, কায়েদা ও শহীদ এই তিন নামে তিনটি শ্রেণি রয়েছে। বিইএম নামে সংগঠনটির ‘লেভেল ওয়ান পাঠ পরিকল্পনা’ বইয়ের ঠিকানা দেয়া হয়েছে বিটিআই ভিলা, ৩৪/৭-এ, গোলাপবাগ, ঢাকা। ইনফ্যান্ট্রি লিডার কোর্সের নিরাপত্তার মৌলিক নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘এখানে ঐ সমস্ত ভাইদের তথ্য থাকবে যারা গোয়েন্দা গ্রুপে কাজ করে। তারা কোথায় কাজ করে, ভিআইপিদের রিপোর্টসমূহ এবং উচ্চতর স্পর্শকাতর তথ্য থাকবে। যদি ‘স্পর্শকাতর ফাইল’ খোয়া যায়, সেক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। কোন একক ব্যক্তির বিদ্রোহের ফলে এরূপ ঘটলে সে সন্ত্রাসী হিসাবে গণ্য হবে এবং শাস্তিযোগ্য হবে। বিদেশিদের সামনে মোবাইল ফোনে সামরিক তথ্য ফাঁস করা হত্যাযোগ্য অপরাধ।’ কয়েকটি খাতায় সাংকেতিক ভাষায় লেখার একস্থানে বলা হয়েছে, ‘কি’ এই শব্দ মোবাইলে বলা যাবে না। ইরাক, আফগানিস্তান ও মিসর এই শব্দগুলো বললে আপনার মোবাইল সিআইডি ধরে ফেলবে। তাই কথা বলার সময় এসব শব্দ বাদ দিতে হবে। একটি অস্ত্র তৈরির কৌশল অঙ্কন করা একটি বই উদ্ধার করা হয়েছে। এই বইয়ে একে-৪৭ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, একে-২২ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেল, এম-৫৬ রাইফেল, এসএমজি, এইচএমজি, পিস্তল ও রিভলবার তৈরির প্রযুক্তির বর্ণনা রয়েছে।
