দেশে কুকুরের কামড়ে আহতদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে। শুধু তা নয়, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে অনুরূপভাবে। পাশাপাশি বাড়ছে তাদের হিংস তা ও ক্ষিপ্রতা। মাথা, চোখ কিংবা সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে কামড়িয়ে। ঐ সকল আহতদের দেখলে যে কেউ ভয় পেয়ে যায়। এমনকি কুকুরের কামড়ে মারাও যাচ্ছে অনেকে। বাড়ছে মরণব্যাধি জলাতংক রোগ। কুকুরের কামড়ের পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সেবা পাওয়া যায় দেশের একমাত্র মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। প্রতিদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কুকুরে কামড়ে আহত ২ শতাধিক রোগী ভ্যাক্সিন ও চিকিত্সার জন্য এ হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু সেখানে কুকুরের ক্ষত স্থানে জীবাণু মারা যাওয়ার একমাত্র নিশ্চিত ভ্যাক্সিন রেবিস ইমোনো গ্লোবিন (আরআইজি) সরবরাহ বন্ধ। অপরদিকে হাসপাতালটির একমাত্র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সিনিয়র কনসালটেন্ট পদটি দীর্ঘদিন শূন্য। এই সিনিয়র কনসালটেন্ট হচ্ছেন হাসপাতালটির প্রশাসনের প্রধান। এসব কারণে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক কুকুরের কামড়ে আহতদের চিকিত্সা নিয়ে কর্তব্যরত চিকিত্সকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটির চিকিত্সা নিয়ে এত বেহাল অবস্থা দেখার কেহ নেই।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক নেতার আত্মীয়ের দোর্দণ্ড প্রতাপে বিশৃঙ্খলা চরমে উঠেছে। নেতার আত্মীয় হওয়ায় তিনি কোন নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করেন না, এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
গতকাল শনিবার অপরাহ্নে সংক্রামকব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে ৭ জন কুকুরের কামড়ে আহত চিকিত্সার জন্য আসেন। তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার সিএনজি চালক মোঃ খোরশেদের ৪ বছরের শিশু পুত্রকে কুকুর কামড়ে মাথা ও ডান চোখসহ দেহের বিভিন্নস্থান ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। তার অবস্থা আশংকাজনক বলে কর্তব্যরত চিকিত্সক জানিয়েছেন। এর আগে জামালপুর থেকে ৫ বছরের এক শিশুকে আনা কুকুর তার ঘাড়ে কামড়িয়ে রগ ছিড়ে ফেলে। সংক্রামকব্যাধি হাসপাতালে নেয়ার সময় চিকিত্সক মৃত বলে ঘোষণা করেন।
জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত চিকিত্সকরা বলেন, বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ যেমন বেড়েছে তেমন বেড়েছে ক্ষিপ্রতা ও হিংস তা। এসকল কুকুর নিধন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় ঘরে ঘরে মরণব্যাধি জলাতংক রোগ দেখা দিবে বলে দ্ধ চিকিত্সকরা জানান।
অপর দুই চিকিত্সক বলেছেন শ্রীলংকায় বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণে জলাতংক রোগ আশংকাজনক হারে বাড়তে থাকায়। সেই দেশে সরকার পরিবেশবাদীদের পরামর্শে কুকুর নিধন না করে ঐসকল কুকুরের রেবিস প্রতিরোধ ভ্যাক্সিন দেয়া শুরু করে। কোন কাজ হয়নি। উল্টা নিধনে বিলম্ব হওয়ায় জলাতংক প্রতিরোধে সরকার বিপাকে পড়ে যায়। অবশেষে বেওয়ারিশ কুকুর নিধনেই সফলতা আসে বলে উক্ত চিকিত্সকরা জানান।
এদেশে কুকুরের কামড়ে জলাতংক রোগ প্রতিরোধে একটি প্রকল্প চালু করা হয় গত কয়েক বছর ধরে। এ প্রকল্পের কার্যক্রম দুর্বল এবং অর্থ লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। সংক্রামকব্যাধি হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থানকারি এক চিকিত্সক সেখানে মসজিদের টাকা আত্মসাতসহ এহেন কোন দুর্নীতি নেই করেননি। তাকে এ অভিযোগে অন্যত্র বদলি করা হয়।
তাকে কুকুরের কামড়ে জলাতংক রোগ প্রতিরোধের প্রকল্পে প্রেষণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়। এ প্রকল্পে যোগদানের পর তার পূর্বে চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয়নি বলে এক কর্মকর্তা জানান। এ কর্মকর্তার কারণে এ প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি চলছে বেহাল দশা। যে কামড়ে কোন রক্ত বের হয়নি ও আঘাত একেবারে সামান্য সেই ক্ষেত্রে নরমাল ভ্যাক্সিন দিলে জলাতংক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কুকুরের কামড়ে রক্ত বের হলে সেই ক্ষেত্রে আরআইজি দিতে হবে। নরমাল ভ্যাক্সিনের পাশাপাশি আরআইজি না দিলে ক্ষতস্থানে জীবাণু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। জলাতংক রোগ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ঐ হাসপাতালে আরআইজি সরবরাহ নেই। তবে ঢাকার বাইরে কুকুরের কামড়ের চিকিত্সা কেন্দ্রে আরআইজি সরবরাহ করা হয়। এসকল কেন্দ্রে আরআইজি ব্যবহার কম হয়। সবচেয়ে দরকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। সিংহভাগ ক্ষেত্রে এ হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষতরা চিকিত্সার জন্য আসে। বেশীর ভাগ মানুষ কুকুরের কামড়ে চিকিত্সার জন্য এ হাসপাতালটিকে চিনে। এ হাসপাতাল আরআইজি ভ্যাক্সিন সরবরাহ না দিয়ে ঢাকার বাইরে অপরিচিত কেন্দ্রে সরবরাহ করার বিষয়টি রহস্যজনক। আরআইজি সরবরাহ করার নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে আহতদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা সর্বাধিক। আঘাতও গুরুতর বলে চিকিত্সকরা জানান।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কুকুরের কামড়ে জলাতংক রোগ প্রতিরোধ প্রকল্পের লাইন ডি বেক্টর অধ্যাপক ডাঃ বেনজীর আহমেদ বলেন, আরআইজি দাম বেশী। এ কারণে সরবরাহ কম দেয়া হয়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী আরআইজি সরবরাহ সীমিত। ঢাকার বাইরের কেন্দ্রে আরআইজি সরবরাহ রয়েছে। বেওয়ারিশ কুকুর না মেরে ভ্যাক্সিন দিয়ে জলাতংক রোগ প্রতিরোধ স্থায়ী সমাধান। সারাদেশে কুকুরের ভ্যাক্সিন দেয়া সফল হলে জলাতংক রোগও নির্মূল হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ সিফায়েত উল্লাহ বলেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা নিয়ে অব্যবস্থাপনা নিরসন করা হচ্ছে। দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করা হবে। কুকুরের কামড়ে ভ্যাক্সিন আরআইজি বন্ধের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
