ওরাই স্পোর্টস রিপোর্টার

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৪৯
ফারিহা আফসানা কান্তা মাছরাঙা টিভিতে বর্তমানে স্পোর্টস রিপোর্টার হিসাবে কর্মরত রয়েছেন ফারিহা আফসানা কান্তা। তার কীভাবে এ পেশায় আসা, কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে তার নানা সুবিধা-অসুবিধার কথা জানতে চাই। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল। বাসায় বাবা, ভাইয়া আমি সবাই মিলে খুব হইচই করে খেলা দেখতাম। বাংলাদেশ ক্রিকেটে জিতলে মিষ্টি কেনার ধুম পড়ে যেত। বাসা জুড়ে এক হইচই। এসবই আমাকে খেলার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আমার পড়াশোনা চাইল্ড ডেভেলাপমেন্ট এন্ড সোশ্যাল রিলেশনশীপে হলেও, আমি শেষ পর্যন্ত স্পোর্টস রিপোর্টিংকেই পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছি। ২০০৯ সালে ফেয়ার এন্ড লাভলী এক স্কলারশীপ দেয়। তাতে আমি নির্বাচিত হই। সে সুযোগে আরটিভিতে আমার ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ হয় এবং তারপর থেকে আরটিভিতে স্পোর্টস রিপোর্টার হিসাবে কাজ শুরু করি। তারপর মাছরাঙা টিভি চ্যানেলে যোগ দেই। এমন পেশায় কাজ করতে গিয়ে সময়ের কোন ঠিক থাকে না। অনেক রাতও হয়। তবু পরিবার, বাবা-মা কারও কাছ থেকেই আমি কখনও নিরুত্সাহিত হইনি বা গুরুতর কোন সমস্যার সম্মুখীন হতেও হয়নি। আমাদের টিমে আমিই শুধু মেয়ে। আমাদের দলের সদস্যদের সবার কাছ থেকেই সবসময় খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পেয়েছি। খেলাধুলার মধ্যে আমার ক্রিকেটই প্রিয়। বাংলাদেশ যেবার নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করল সেবার আমিই কাভার করেছিলাম। সেদিন যে কি আনন্দ হয়েছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। আর দেশের মাটিতে বিদেশের নানা খেলোয়াড়, ক্রিকেটারদের ইন্টারভিউ আমি নিয়েছি। অফিসিয়াল ইন্টারভিউ ও এর পাশাপাশি সাধারণ গল্প, আলোচনাও হয়েছে তাদের সাথে। খুব কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের দেখার ও কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে এ পেশা। তবে সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে এখনও সে মনমানসিকতা তৈরি হয়নি। বিশ্বকাপের ম্যাচ কাভার করার সময় দর্শকদের সারি থেকে কখনও কখনও নানা বিব্রতকর মন্তব্য বা কথাও শুনতে হয়েছে। দর্শকদের এ ধরনের মন্তব্য শুনতে খুব খারাপ লাগে। তাদেরকে নানা খেলার মুহূর্তে নিয়ে যাবার সুযোগ করে দেবার জন্যই তো আমাদের এ পেশা গ্রহণ। দর্শকদের কাছ থেকে আরও প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনাই আমাদের কাম্য। এছাড়াও কাজ করতে করতে বেশি রাত হয়ে গেলে আমাদের সামাজিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাও একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তবুও সবধরনের প্রতিবন্ধকতাকে ছাড়িয়ে এ ধরনের পেশায় দিন দিন নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে, সেটাই আমার কামনা। 00000 সায়লা পারভীন সময় টিভিতে কাজ করছেন সায়লা পারভীন। এ পেশায় আসার পর তার এক বছরের বেশি হতে চলল। চাকরি জীবনে এমন চ্যালেঞ্জিং পেশায় আসতে পেরে তার মনের অনুভূতি জানতে চাইলাম। তিনি বলেন, খেলা উপভোগ না করলে এ ধরনের পেশায় কাজ করা সম্ভব না। স্পোর্টস রিপোর্টার হিসাবে কাজ করতে হলে, তাকে খেলা উপভোগও করতে হবে। আমার পড়াশোনা সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফি এনভায়রনমেন্টের ওপর। তারপরও খেলার প্রতি আমার আগ্রহ থেকেই আমি এ পেশাকে গ্রহণ করেছি। এ পেশায় কর্মরত থাকতে পেরেই আমার ইচ্ছাগুলো পূর্ণ হয়েছে। খেলোয়াড়দের খুব কাছে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলার আমার যে ইচ্ছা ছিল তা পূর্ণ হয়েছে। খেলার সময় তাদের মনের অনুভূতি কী হয়, এ সবই জানার সৌভাগ্য হয়েছে। খেলার মধ্যে ক্রিকেটই আমার প্রিয়। দিন দিন খেলার জগতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। স্পোর্টস রিপোর্টিংয়েও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। চাকরির পরিবেশভাগ্যও আমার খুবই ভাল। তবে কাজ করতে করতে আমার অনেক সময়ই খুব রাত হয়ে যায়। সে সময় মা-বাবা অনেক চিন্তা করেন। সারাক্ষণই এক দুঃশ্চিন্তা তাদের তাড়া করে, এত রাতে আমি নিরাপদে বাসায় পৌঁছাতে পারব তো! তবুও তারা সবসময়ই আমাকে আমার পেশার ব্যাপারে উত্সাহ দিয়ে আসছেন। প্রতিদিনই নতুন কিছু করছি, নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। খেলার জগত্, খেলোয়াড়দের জগেক নতুন করে জানার সুযোগ হচ্ছে। অনেক খেলোয়াড়কে খুব কাছ থেকে জানতেও পেরেছি। নিজের কাজের মধ্য দিয়ে উত্তেজনার মুহূর্তে, অন্যদের মাঝেও আনন্দ ছড়িয়ে দেবার সুযোগ পাওয়ার ভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। স্পোর্টস রিপোর্টিং এর মত উত্তেজনাময় ক্ষেত্রের অংশ হতে পেরে তাই আমি আনন্দিত। তবে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়ই দর্শকদের কাছ থেকে কষ্টকর ব্যবহার পেতে হয়। তাদের আচরণে উপলব্ধি করি, যতই প্রগতিশীলতার কথা আমরা বলি না কেন সামাজিকভাবে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্পোর্টস রিপোর্টিংয়ের মত পেশা নারীদের জন্য নয়। বিভিন্ন খেলা কাভার করতে গিয়ে তাই আমার পেছন থেকে নানা মন্তব্য, বাজে কথা শুনতে হয়েছে। যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কোন পরিবার তাদের মেয়েকে এ ধরনের পেশায়, তার আগ্রহের ক্ষেত্রে চাকরির ব্যাপারে উত্সাহ দিলেও কোন স্বামী তার বউ এর পেশা হিসাবে এমন চ্যালেঞ্জিং পেশাকে মেনে নিতে চান না। চিরকালের পুরনো সেই ধ্যান-ধারণা থেকে তাই আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।