সাল ১৯৩৫। পায়ের নিচে মাটি খুঁজতে থাকা ভারতীয় চলচ্চিত্র পাড়ায় মুক্তি পেল সি. এম. লুহার পরিচালিত ছবি তালাশ-ই-হক। ছবিতে ছোট্ট একটা চরিত্রে শিশু শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করলো ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে। ছবির শেষে তার পরিচয় জানা গেল ‘বেবি নার্গিস’। এই ছবির মধ্য দিয়েই হারিয়ে গেল ফাতিমা রশিদ বলে একটি নাম আর বলিউড পেল তার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এক অভিনেত্রীকে। হ্যাঁ পাঠক, বলা হচ্ছে ভারতীয় সিনেমার সবচে’ বড় সুপারস্টারদের একজন নার্গিসের কথা। ১৯৩৫’র জুনের প্রথম দিনে কলকাতায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নার্গিসের। ক্লাসিকাল সংগীত শিল্পী মায়ের হাত ধরেই আড়মোড়া ভাঙ্গতে থাকা ভারতীয় চলচ্চিত্রে নার্গিসের আগমন। মিষ্টি চেহারা কিংবা যে কারণেই হোক প্রথম ছবির পরিচালক লুহার তার নাম পাল্টে রাখেন ‘নার্গিস’, ড্যাফোডিল ফুলের ফার্সি প্রতিশব্দ। প্রথম ছবি মুক্তির ঠিক সাত বছর পর মুক্তি পায় নার্গিসের দ্বিতীয় ছবি তামান্না। তবে তিনি প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন হিন্দি সিনেমার পথিকৃত পরিচালক-প্রযোজক মেহবুব খানের তাকদির ছবির মাধ্যমে। মতিলালের বিপরীতে এই ছবিই পাল্টে দেয় নার্গিসের ভবিষ্যত্।
বলিউডে চিরস্থায়ী করে নার্গিস নামটি। প্রকৃত নাম ফাহিমা রশিদের বদলে নার্গিস নামেই তিনি কাটিয়ে দেন অভিনয় জীবনের বাকি সময়টা। চল্লিশ দশকের শেষ এবং পঞ্চাশ দশকের শুরুতে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিতে থাকেন নার্গিস। রূপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তার ভক্তের সংখ্যাও। বারসাত, আন্দাজ, আওয়ারা, দিদার, শ্রী ৪২০, চোরি চোরির মতো ছবিগুলো শুধু দর্শক নয়, দৃষ্টি কাড়ে সমালোচকদেরও। রাজ কাপুরের সঙ্গে নার্গিসের তার অন স্ক্রীন পারফরম্যান্স পরিণত হয় হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটিতে। আর এই অন স্ক্রীন রসায়নই শীঘ্রই ডানা মেলতে থাকে রূপালী পর্দার বাইরেও। পঞ্চাশের দশকে হিন্দি পত্রিকাগুলোর বড় আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় এই দুজনের রোমাঞ্চ কাহিনী। তবে নানা কারণে শেষ পর্যন্ত সেটা আর পরিণয়ে রূপ নিতে পারেনি।
ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ মুহূর্তে নার্গিস লাভ করেন তার অভিনয় জীবনের সেরা সাফল্য। মেহবুব খানের অস্কার মনোনীত ছবি মাদার ইন্ডিয়া নার্গিসকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। গ্রামীণ দরিদ্র হিন্দু সমাজের উপর নির্মিত এই ছবিতে রাধা চরিত্রে নার্গিসের অসাধারণ অভিনয় জয় করে ফিল্মফেয়ার জুরিদের মনও। শেষ পর্যন্ত অস্কার জিততে না পারলেও চিরায়ত ভারতীয় নারীর ভূমিকায় নার্গিসের অনন্য সাধারণ অভিনয় এখনো দাগ আছে লাখো দর্শকের হূদয়ে। এর ঠিক এক বছর বাদে রূপালী পর্দার আরেক বিখ্যাত অভিনেতা এবং মাদার ইন্ডিয়ার সহকর্মী সুনীল দত্তকে বিয়ে করে অভিনয় জীবনকে বিদায় জানান মোহময়ী এই অভিনেত্রী। পঞ্চাশটিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করা নার্গিসের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি স্বরূপ র্যাডিফ ডট কম ২০১১ সালে তাকে ঘোষণা করে সর্বকালের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। তার সম্পর্কে বলা হয়, ‘স্টাইল, সৌন্দর্য আর পর্দায় সপ্রতিভ উপস্থিতি; এ সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন একজন যাকে সবসময়ই মনে রাখতে হবে।’ অবসর ভেঙ্গে ১৯৬৭ সালে রাত আউর দিন ছবির মাধ্যমে আবারো অভিনয়ে ফেরেন নার্গিস। আর এই ছবি তাকে এনে দেয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা, জাতীয় পুরস্কার। এই ক্যাটাগরীতে তিনিই প্রথম জাতীয় পুরস্কার জেতেন। তবে এই পুরস্কারও নার্গিসকে অভিনয়ে আর মনোযোগী করতে পারেনি। ফলে এটিই হয়ে থাকে তার শেষ ছবি। অভিনয় জীবনের মতো বিবাহিত জীবনেও দারুণ সফল নার্গিস।
সুনীল দত্তের সঙ্গে প্রায় ২৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের ঘর আলো করে আসে দুটি কন্যা এবং একটি পুত্র সন্তান। তাদেরই একজন সঞ্জয় দত্ত, বর্তমানে বলিউডের দারুণ জনপ্রিয় তারকা। অন্যদিকে দুই কন্যার একজন প্রিয়া যে কিনা ২০০৫ সাল থেকে লোক সভার সদস্য। এ তো বলা হলো ব্যক্তি আর অভিনেত্রী নার্গিসের কথা। একজন সামাজিক উন্নয়ন কর্মী হিসেবেও নার্গিসের অবদান স্মরণীয়। সুনীল দত্তের সঙ্গে নার্গিস গড়ে তোলেন অজান্তা আর্টস কালচারাল ট্রূপ। সংস্থাটির কাজ ছিল দুর্গম সব যুদ্ধ ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিনোদনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পারফর্ম করা প্রথম বিদেশি সংগঠনও ছিল অজান্তা। বর্ণাঢ্য এক জীবন শেষে ১৯৮১ সালের তিন মে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান নার্গিস। এর ঠিক চারদিন পর মুক্তি পায় সঞ্জয়ের প্রথম ছবি রকি। নার্গিসের মৃত্যু রকির প্রিমিয়ারে যোগ করে অন্য এক মাত্রা। নার্গিসের সম্মানে ঐ অনুষ্ঠানে একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথম চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে ১৯৫৮ সালে নার্গিস লাভ করেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। দেশটির জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের একটি ক্যাটাগরীকে ‘নার্গিস দত্ত অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট ফিচার ফিল্ম অন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ ঘোষণা করা হয়। মুম্বাইয়ের মেরিন রোডে যে রাস্তায় নার্গিসকে সমাহিত করা হয় সেটিও এখন পরিচিত নার্গিস দত্ত রোড নামে।
