নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না জামায়াত

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৮
নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল থাকলে আগামীতে জাতীয় সংসদের কোন নির্বাচনে দলগতভাবে অংশ নিতে পারবে না বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এমনকি দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে ভোট করতে পারবেন না দলটির কোন নেতাকর্মী। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে জামায়াত নেতাকর্মীদের। হাইকোর্টের রায়ের কারণেই বরগুনা-২ আসনের আসন্ন উপ-নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না ১৮ দলীয় জোটের শরীক জামায়াতে ইসলামী। গতকাল রবিবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবালয়ে শূন্য ঘোষিত বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বেতাগী-বামনা) আসনের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের দেয়া বক্তব্য থেকে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে উপ-নির্বাচন। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আগামী ৫ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৭ সেপ্টেম্বর আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৫ সেপ্টেম্বর। এই উপ-নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে যে রায় দিয়েছেন, তা এখনও বহাল আছে। এ ব্যাপারে আপিল বিভাগ থেকে কোনো স্থগিতাদেশ দেয়া হয়নি। এ কারণে দলটির কেউ এই উপনির্বাচনে নিজস্ব প্রতীক (দাঁড়িপাল্লা) নিয়ে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে অন্য প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হতে পারবেন।’ আগামী সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণ বিষয়ে সিইসি বলেন, আদালতের রায় বহাল থাকলে জাতীয় নির্বাচনেও দলটি অংশ নিতে পারবে না। তবে উচ্চ আদালতের রায়ের কপি এখনো তারা হাতে পাননি। পেলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনে নির্বাচন কমিশন। সে সময় ৩৮টি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীও নিবন্ধিত হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, শুধু নিবন্ধিত দলগুলোকেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়। তবে শর্তসাপেক্ষে ছায়া গঠনতন্ত্র জমা দিয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল জামায়াত। শর্ত ছিল, নির্বাচনের পর দলগুলো জাতীয় সম্মেলনে ছায়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করিয়ে তা কমিশনে জমা দেবে। ২০১০ সালের মধ্যে দলগুলো অনুমোদিত গঠনতন্ত্র কমিশনে জমা দেয়। কমিশন কয়েক দফায় এসব গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে। পরে বেশ কয়েকটি দলের গঠনতন্ত্রে ত্রুটি ধরা পড়ে। এর মধ্যে জামায়াত অন্যতম। জামায়াতের নিবন্ধন যে প্রক্রিয়ায় অবৈধ ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন পায় জামায়াতে ইসলামী। তবে ওই সময়ে জামায়াত যে গঠনতন্ত্র জমা দেয় তাতে বেশকিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্রের ধারা সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতকে নির্বাচন কমিশনের দেয়া নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-এর সভাপতি হুমায়ূন কবির, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হাসানসহ ২৫ ব্যক্তি। ওই রিটের শুনানি শেষে ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি রিট আবেদনের ওপর বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতার প্রশ্নে রুল জারি করেন। রুলে রাজনৈতিক দল হিসাবে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর ইসির দেয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি (১) (বি) (২) ও ৯০(সি) ধারার লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না মর্মে জানতে চাওয়া হয়। জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে রিট আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানির লক্ষ্যে একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন রিট আবেদনকারিগণের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। গত এপ্রিল মাসে রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। গত ১২ জুন শেষ হয় শুনানি। গত ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট। বিচারপতি এম মোয়াজ্জেম হোসেনের সভাপতিত্বে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হককে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ রায় দেয়া হয়। ওইদিনই চেম্বার জজের কাছে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল জমা দেন জামায়াতের আইনজীবীরা, যাতে রায়ের ওপর স্থগিতাদেশও চাওয়া হয়। তবে ৫ আগস্ট শুনানি করে চেম্বার আদালত রায় স্থগিতের আবেদন নাকচ করে দেয়। তবে জামায়াত আপিলের শুনানিতে আবারো স্থগিতাদেশ চাইতে পারবে। প্রসঙ্গত, জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে রুল জারির পর ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে একবার, ২০১০ সালের জুলাই ও নভেম্বরে দু’বার এবং ২০১২ সালের অক্টোবরে একবার এবং সর্বশেষ ওই বছরের নভেম্বরে দলটি তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। ৭২ বছরে তিনবার নিষিদ্ধ ব্রিটিশ-ভারতে ১৯৪১ সালে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে ওই বছরের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে দলটির ঘোষণা দেন মাওলানা আবু আলা মওদুদী। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই জামায়াত বৃহত্ ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে গড়ে ওঠে। দেশ ভাগের পর মওদুদীও ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান। আর বাংলাদেশের বর্তমান জামায়াতে ইসলামী মূলত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতেরই রূপান্তর। অতীত রেকর্ড বলছে, প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরের মাথায় জামায়াত প্রথম নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ হয় দলটি। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় দফা নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় দলটি। এরপর জামায়াত রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় বর্তমান সরকারের আমলে। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় দলের শীর্ষ নেতাদের। ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ তিন নেতার মৃত্যুদণ্ড এবং দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বরগুনার উপ-নির্বাচন ৩ অক্টোবর আগামী ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বরগুনা-২ আসনের উপ-নির্বাচন। আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচনের কথা রয়েছে। আর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে শূন্য হওয়া বরগুনা-২ আসনে উপ-নির্বাচন আগামী ২৩ অক্টোবরের মধ্যে করতে হবে কমিশনের। এ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম সবুর গত ২৬ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আসনটি শূন্য হয়। উপ-নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোস্তফা ফারুককে। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়েছে পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, বরগুনা-২ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৩ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৯৬টি ও ভোটকক্ষ ৪৯৯টি। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কেউ মিছিল বা শো-ডাউন করতে পারবে না। কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সিইসি বলেন, যেসব দেশ বা দাতা সংস্থা নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে থাকে তাদের সঙ্গে মঙ্গলবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলের সংলাপের বিষয়ে তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। দেখা যাক পরিস্থিতি বিবেচনায় কি করা যায়। তফসিল ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ, ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক উপস্থিত ছিলেন।