চারদিন আগে বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা করে ঐশী রহমান। পুরো বিষয়টি বন্ধু জনির সঙ্গে আলোচনা করে। জনিও তাকে বাবা-মাকে হত্যার ব্যাপারে উত্সাহিত করে। ঘটনার দিন বাবা-মাকে হত্যার এক ঘণ্টা আগে হুইস্কি খেতে বসে ঐশী। আগে থেকেই দুই বোতল মদ বাসায় এসে ওয়ারড্রবের ভেতরে লুকিয়ে রাখে। মদের বোতল দু’টি জনিই তাকে দিয়েছিল। রাত ২টার দিকে ‘কিলিং মিশন’ শুরু করে। আদালতে দেয়া ঐশীর জবানবন্দিতে এসব তথ্য মিলেছে। গৃহকর্মী সুমিও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালতে দেয়া তাদের দুজনের ওই জবানবন্দির কপি ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে ঐশী বলেছে, ‘রাত ২টার দিকে দুইপাশে ধারালো একটি চাকু নিয়ে মায়ের রুমে ঢুকি। আম্মু কাত হয়ে ঘুমাচ্ছিল। আম্মুর পাঁজরের নিচে পেটের পাশে চাকু দিয়ে স্টেপ করলে আম্মুর ঘুম ভেঙে যায়। ছোট ভাই অহিও জেগে উঠে। অহি চিত্কার শুরু করে। তখন অহিকে বাথরুমে নিয়ে আটকে রাখি। আম্মুর পাশে এসে বসি। আম্মু বলে, আমি তোর মা.....না। আম্মু পানি খেতে চায়। আমি আম্মুর রুমে থাকা জমজমের পানি খেতে দেই। এরপরই আম্মুকে আরো কয়েকবার স্টেপ করি। তবে ক’টি স্পষ্ট মনে নাই। আম্মুর কষ্ট হচ্ছিল দেখে শেষে গলার মধ্যে স্পেট করি। তখন আম্মু মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে বিছানা থেকে ফ্লোরে পড়ে গিয়েছিল।’
জবানবন্দিতে ঐশী বাবাকে হত্যা সম্পর্কে বলেছে, ‘আম্মুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আব্বুর রুমে গিয়ে আব্বুর গলার মধ্যে স্টেপ করি। কিছুক্ষণ পর বাবা মারা যায়। সুমি তখন গেস্টরুমে ঘুমাচ্ছিল। দরোজা আটকানো ছিল। আমি সুমিকে ডেকে তুলি। এবং বলি, আব্বু-আম্মুকে মেরে ফেলেছে। সুমি জানতে চেয়েছিল কে মেরে ফেলেছে। আমি কিছু বলি নাই। সুমিকে সাথে নিয়ে আব্বু ও আম্মুর লাশ আমার রুমের (আব্বু যে রুমে ঘুমাচ্ছিলেন) বাথরুমে রেখে দেই। আম্মুর রুমের রক্তমাখা বেডশিট আমার রুমে নিয়ে রাখে সুমি। এরপর সুমি আম্মুর রুম পরিষ্কার করে। আমি গোসল করি এবং আমার পোশাক চেঞ্জ করি। আমার রুম লক করে রাখি যাতে অহি কিছু বুঝতে না পারে। এরপর অহিকে বাথরুম থেকে বের করে নিয়ে আসি। এরপর অহিকে বলি, আম্মুর একটু ইনজুর্ড হয়েছে, আব্বু হাসপাতালে নিয়ে গেছে আম্মুকে। অহিকে বলি, আমরা অন্য জায়গায় চলে যাব। আব্বু এসে আমাদের নিয়ে আসবে। আম্মুর লাশ বাথরুমে ঢোকানোর আগে আংটি ও চুরি খুলে রাখি।’
ঐশী আরো বলেছে, ‘ঘটনার পর জনিকে ফোন করি। সে ফোন ধরেনি। এরপর জনির মাধ্যমে পরিচিত এক আঙ্কেল রকির সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং আশ্রয় চাই। তখন রকি আঙ্কেল রনি নামে একজনকে বাসা ঠিক করে দিতে বলেন।’ আরেক জায়গায় ঐশী বলেছে, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটের দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আশ্রয়ের জন্য সিএনজি নিয়ে সারাদিন ঘুরি। দিনের বিভিন্ন সময় রকি ও জনির সঙ্গে দেখাও হয়। আর রনির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। রাতে থাকার জায়গা না পেয়ে সুমিকে এক সিএনজি চালকের বাসায় রাখি। আরেক সিএনজি চালক আমাকে ও অহিকে তার মালিকের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তার মালিক সম্ভবত ব্যাংকে চাকরি করেন। ওইদিন রাতে সুবর্ণা খালার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সুবর্ণা খালাই রবিউল মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমার সঙ্গে রবিউল মামার কথাও হয়। তাই অহিকে রিক্সায় উঠিয়ে দেয় মামার বাসায় যাওয়ার জন্য। পরদিন শুক্রবার রাতে ছিলাম রনির খালার বাসায়, তার নাম কুলসুম। বাসা বাসাবোতে। রাতে আমার অনুশোচনা হতে থাকে। আমি সিদ্ধান্ত নেই সব ঘটনা প্রকাশ করে দেব। শনিবার সকালে উত্তরায় সুবর্ণা খালার বাসায় যাই। খালাকে না পেয়ে পল্টন থানায় চলে আসি এবং সব ঘটনা খুলে বলি।’
জনি ও রকির পরিচয়ের ব্যাপারে ঐশী বলেছে, ‘জনি আমার বন্ধু, তার বয়স ২৫/২৬ হবে। গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ, থাকে ঢাকায়। আফতাব নগরে স্টেপ আপ নামে তার একটি নাচের স্কুল ছিল। পরবর্তীতে জানতে পারি জনির বাড়ি রূপগঞ্জে। জনির সঙ্গে ইয়াবা সেবন করতাম, সেই ইয়াবা সাপ্লাই দিত। আর রকির সঙ্গে পরিচয় হয় জনির মাধ্যমেই। বাড্ডা এলাকার ৮ নাম্বার রোডে রকির অফিস আছে। রকি রেন্ট এ কারের ব্যবসায়ী। বয়স অনুমান ৪০ বছর।’ নিজের সঙ্গে পরিবারের দুরত্বের কথা বলতে গিয়ে ঐশী বলেছে, ‘আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন থেকেই আব্বু-আম্মুর সঙ্গে দুরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। আব্বু-আম্মু আমাকে মারধর করতেন। আমি একাধিকবার পালিয়ে যাই। আমাকে খোঁজ করে এনে বাসায় আটকে রাখা হত। আমি বাসায় কারো সঙ্গে কিছু শেয়ার করতে পারতাম না। জনির সঙ্গে সবকিছু আলোচনা করতাম। ঘটনার চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই আব্বু-আম্মুকে মেরে ফেলার চিন্তা করতেছিলাম। জনিকে পরিকল্পনার কথা জানাই। জনি বলে তাদের শেষ করে দেয়ার জন্য। পরবর্তীতে শেল্টার লাগলে সে ব্যবস্থা করবে।’
ঐশী তার জবানবন্দির শুরুতে বলেছে, ‘বিগত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার আমি ওষুধের দোকান থেকে তিন পাতা টেনিল ও তিন পাতা নাইট্যাস (মোট ৬০টি) কিনে এনে রাখি। পরদিন শুক্রবার বাসায় আব্বু-আম্মুর জন্য কফি তৈরি করি। সব ওষুধই গুঁড়ো করে কফির সঙ্গে মিশিয়ে দেই। মাগরিবের নামাজের পর আম্মুকে কফি খেতে দেই। আম্মু কফি খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। রাত ১১টার পর অবশিষ্ট কফি গরম করে বাবাকে খেতে দেই। বাবাও কফি পান করে ঘুমিয়ে যান। এরপর রাত ১টায় হুইস্কি খেতে শুরু করি। এটা শেষ করে হত্যা মিশন শুরু করি রাত ২টার দিকে।’
ঐশী পক্ষের সব আবেদন খারিজ
বাবা-মা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার ঐশী রহমানের পক্ষে করা সবগুলো আবেদনই খারিজ করে দিয়েছে আদালত। গতকাল রবিবার মহানগর হাকিম ও কিশোর আদালতের বিচারক আনোয়ার ছাদাত এই আদেশ দেন। এর আগে শনিবার মাহাবুব হাসান রানাসহ ঐশীর আইনজীবীরা কয়েকটি আবেদন করেন। ঐশী বিষয়ক শুনানি কিশোর আদালতে নেয়ারও আবেদন জানান তারা। আবেদনে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার মেয়েকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ দাবি করে তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে যেতে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের অনুমতি দেয়ার জন্য আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। ঐশীর পক্ষে জামিনের আবেদনও জানিয়েছিলেন তার বাবার দিকের আত্মীয়দের নিয়োগ করা এই আইনজীবীরা। এসব আবেদনের ওপর শুনানিতে ঐশীর পক্ষে ছিলেন প্রকাশ বিশ্বাস, মাহবুব হাসান রানা, আসাদুজ্জামান ও মোশাররফ হোসেন। তাদের সহায়তা করেন জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির রেহানা সুলতানাসহ দুই আইনজীবী।
জামিন নাকচের আদেশে বলা হয়, আসামি ঐশী রহমান নিজে তার বাবা-মাকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে বক্তব্য দিয়েছে। সে সজ্ঞানে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। যে কারণে এই মুহূর্তে তার জামিন আবেদন নাকচ করা হলো। ঐশীর চিকিত্সার ব্যাপারে আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেন, ঐশী মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল এমন কোনো চিকিত্সার সনদ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। যে কারণে আবেদন খারিজ করা হলো। এ বিষয়ে প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, তাদের সবগুলো আবেদনই আদালত নাকচ করে দিয়েছেন।
এমব্রয়ডারির প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ঐশী
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী হত্যায় গ্রেফতার তাদের মেয়ে ঐশীকে গাজীপুরে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে এমব্রয়ডারির প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ঐশী ও গৃহকর্মী সুমিকে শনিবার রাতে ঢাকা কারাগার থেকে এই কোনাবাড়ির কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। গতকাল সকালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বেগম নাসিমা ও গাজীপুরের উপ-পরিচালক লুত্ফুন্নেছা কেন্দ্র পরির্দশনে যান। ঐশীর পছন্দ অনুযায়ী ওই কাজ দেয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক (সুপারিনটেনডেন্ট) তাসলিমা বেগম জানান, শনিবার রাত ৯টার দিকে পুলিশ হেফাজতে তাদের ঢাকা থেকে এ কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ঐশীকে অনেকটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। ঐশীকে তৃতীয় তলায় এবং সুমিকে ৪র্থ তলায় রাখা হয়েছে। আসার পর ঐশীকে জানানো হয়, এখানে বাসার মতো তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই, সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ও নেই। তারপরও অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে বলেন তাসলিমা। ওই সময় ঐশীর পরনে ছিল জিন্সের প্যান্ট, নীল-সাদা গ্রামীণ চেকের শার্ট ও সাদা ওড়না। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত গাজীপুর সদর উপজেলার কোনাবাড়িতে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ১৫০। এখানে এখন রয়েছে ১১০ জন কিশোরী। মানসিক পরিবর্তনে এখানে নিবাসীদের কাউন্সেলিং করা ছাড়াও ধর্মীয় শিক্ষা, সেলাই, বাটিক, রান্না ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। নিবাসীদের সকাল সাড়ে ৮টায় নাস্তা, বেলা ১টায় দুপুরের খাবার, বিকাল সাড়ে ৫টায় নাস্তা এবং রাত ৮টায় রাতের খাবার দেয়া হয়।
