আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নাটকীয়ভাবে নতুন মাত্রারও উদ্ভব হতে পারে। দেশের অনেকের দাবি এবং বিদেশি কারও কারও প্রত্যাশা পূরণে নির্ধারিত সময় শেষে সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে বর্তমান সরকার। এমনকি অনির্বাচিত কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণাও দিতে পারে আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের কেউ কেউ ঘণিষ্ঠ মহলে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে যারা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিরোধী জোট ছাড়াও আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলও সার্বক্ষণিক শুধু সরকারের ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরছে। সরকার সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ-এমন বক্তব্য প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। শেয়ারবাজার, হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির কথা বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে না পারার ব্যর্থতা ফলাও করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে-মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান চালিয়ে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এভাবে সরকারের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগের স্তূপের উচ্চতা বাড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে এবং অনেক সভা-সেমিনারেও শুধু সরকারের সমালোচনার খই ফুটছে। আওয়ামী লীগের এই নেতাদের ভাষ্য, এসব কারণে মেয়াদ শেষ হলেই পদত্যাগ করে চলে যাবার বিষয়টিও সরকারের চিন্তা-ভাবনায় রয়েছে। পদত্যাগ করলে দেশে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে কী হবে না, কারা দেশ পরিচালনা করবে-এসব বিষয়ের দায়িত্বও আওয়ামী লীগ একা ভাবতে যাবে কেন-ঘরোয়া আলাপে এমন প্রশ্নও তুলছেন দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন-বিরোধী দলসহ অনেকে যেমন বলছে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে না, তেমনি অনির্বাচিত সরকারের অধীনেও নির্বাচন হতে পারে না বলার অধিকার আওয়ামী লীগেরও রয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বলছে, তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না, এমনকি এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিও বলছে-বিএনপি না গেলে তারাও নির্বাচনে যাবে না, আরও কেউ কেউও অভিন্ন কথা বলছে। বিরোধী জোটসহ কারও কারও দাবি এবং আন্তর্জাতিক কোনো কোনো মহলের চাওয়া অনুযায়ী যদি নির্দলীয় সরকার আসে আর তখন যদি আওয়ামী লীগ বলে ‘আমরা অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবো না’, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? দলটির নেতাদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতির যে উদ্ভব ঘটবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর তখন আওয়ামী লীগসহ তাদের সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কাদের নিয়ে হবে? সেই নির্বাচন কি একতরফা বা প্রহসনের হবে না?
এই উপমহাদেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরও কেউ কেউ বলছেন, সরকার কিংবা আওয়ামী লীগের মধ্যে এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা থাকা অমূলক নয়। যার কারণে সকল রাজনৈতিক পক্ষের অবস্থান বিবেচনায় রেখেই সমঝোতার পথ বাতলানো সমীচীন। এক পক্ষকে রাজি করাতে গিয়ে আরেক পক্ষ যেন বেঁকে না বসে, সেটিও আগাম বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এই বিশেষজ্ঞরা এ-ও বলছেন যে, শুধু নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়েই নয়, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সামষ্টিক অগ্রগতির ওপরও সবার গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ যারা উদ্বিগ্ন, চিন্তিত এবং এটা রোধে বাংলাদেশের গৃহীত কোনো পদক্ষেপেই যাদের আপত্তি নেই, বিষয়টি তাদের বিবেচ্য হওয়া দরকার। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে যারা প্রভাব রাখেন, তারা যদি মনে করেন অন্য কোনো পটপরিবর্তনেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব তাহলেও বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের হিসাব মেলাতে হবে।
উপমহাদেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, বহির্বিশ্বের যারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদের উত্থানের আশঙ্কা করছেন কিংবা এ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, তারা যদি মনে করে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়েও তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণ হতে পারে বা তারা স্বস্তিতে থাকতে পারবেন, তাহলে সেটি ভিন্ন কথা। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে শুধু ভারতের জন্যই নয়, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে যারা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের জন্যও বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের বিষয়টি চিন্তা-ভাবনার ব্যাপার। এছাড়া জাতিসংঘসহ যেসব দূত বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন তাদেরও বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তা না হলে, বাংলাদেশে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক বা না হোক, এই অঞ্চলের যে স্থিতিশীলতা ভারত ও চীনসহ অনেকের প্রত্যাশা তা অর্জন অসম্ভব না হলেও দুরূহ হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
