নজরুলের শিশুতোষ রচনায় দুলি, বাচ্চি ও জটু

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৩
এক পাড়ে বর্ধমান আরেক পাড়ে বীরভূম। মাঝ দিয়ে কল কল ছল ছল করে বয়ে গেছে অজয় নদ। এই অজয় নদের তীরে তাল-তমাল আর মহুয়া বনে ঘেরা ‘চুরুলিয়া’ গ্রাম। ‘চুরুলিয়া’ ছিল এক সময় রাজা নরোত্তম সিংহের রাজধানী। বর্গীর হামলায় এক সময় চুরুলিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যায়। তবুও রাজার গড় ও ‘রাণীর গড়’ ধ্বংস্তূপের মধ্যে আজো সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুসলিম শাসন আমলেও চুরুলিয়ায় গড়ে উঠেছিলো কাজীর বিচারালয়। এই বিচারালয়ের ‘কাজী’ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের একজন পূর্বপুরুষ। নজরুলের পূর্ব পুরুষেরা মধ্যপ্রাচ্যের বাগদাদ থেকে চলে আসেন ভারতে। তারপর ‘চুরুলিয়া’য় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন । এই চুরুলিয়া ভারতের বর্ধমান জেলায় অবস্থিত। এই ‘চুরুলিয়া’ গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ, মায়ের নাম জাহিদা খাতুন। কাজী ফকির আহমদ ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। আরবী, ফারসী, উর্দু ভাষায় তাঁর ছিল ব্যুত্পত্তি। হাতের লেখা ছিল মুক্তার মত ঝকঝকে। নিটোল স্বাস্থ্যের অধিকারী এই মানুষটি উদার, সরলতা, দানশীলতা আর বিষয়-বুদ্ধিহীনতার দরুন সম্পত্তি হারিয়ে হয়ে পড়েন নিঃস্ব। অবশেষে সংসারের ব্যয়ভার বহনের জন্য মসজিদের ইমামতি, পীরের মাজারের খাদেমগিরি আর সেই সাথে আত্মনিয়োগ করেন দলিল-দস্তাবেজ লেখার কাজে। নজরুল যখন নয় বছরের বালক তখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কাজী ফকির আহমদের মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের তাড়নায় মসজিদের ইমামতি, হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেমগিরি, পাড়ায় পাড়ায় মিলাদ শরীফ পড়াতে শুরু করেন নজরুল। চাচা কাজী বজলে করীমের কাছে নজরুল পেয়েছিলেন বাল্যশিক্ষা। সেই সাথে পেয়েছিলেন গানের প্রশিক্ষণ। বড়ভাই সাহেবজান ছিলেন একজন গীতিকবি। তিনি সাঁওতালী ঝুমুর গানের অনুকরণে লিখেছিলেন বেশকিছু গান। চাচা কাজী বজলে করীমও ছিলেন একজন কবি। তিনি ‘লেটো দলে’র জন্য লিখেছিলেন ‘পঞ্চ পান্ডবের ডাকসুরা’, ‘সন্ন্যাসীর ডাকসুরা’, ‘সোহরাব-রুস্তমের পালাগান’। কবি নজরুলও চাচার সাহচর্যে এসে লেটো দলের জন্যে লিখেছিলেন ‘আকবর বাদশার সঙ’, ‘রাজপুত্রের সঙ’, ‘কালিদাস কবির সঙ’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’, ‘চাষার সঙ’, ‘শকুনী বধ’এর সঙ’, ‘মেঘনাদ বধ-এর সঙ’ প্রভৃতি। ‘চুরুলিয়া’র প্রাচীন ঐতিহ্যে ঘেরা ‘রাজারগড়’। কবি নজরুল এই রহস্য রোমাঞ্চে ভরা ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে কবিতা রচনা করেন। আবার জনৈক দরবেশের শোচনীয় মৃত্যুতেও রচনা করেছেন ‘মুক্তি’ শীর্ষক একটি কবিতা। নজরুল ছিলেন একজন চারণ কবি। তিনি কখনো কোন পরিবেশ কিংবা কোন ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে রচনা করেছেন গল্প, কবিতা ও গান। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ‘তেওতা’ গ্রামের ছিল নামকরা সেন পরিবারের নিবাস। সেন পরিবারের বসন্ত কুমার সেন ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের নায়েব। বসন্ত কুমার সেনের ছোটভাই ইন্দ্রকুমার সেন ছিলেন কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর ইন্সপেক্টর। বসন্তকুমার সেনের স্ত্রী গিরিবালা দেবী, তাঁর একমাত্র কন্যা আশালতা সেন। তাঁর ডাকনাম দোলন বা দুলিসহ ‘তেওতা’ গ্রামে বসবাস করতেন। আর ইন্দ্রকুমার সেন তাঁর স্ত্রী বিরজাসুন্দরী দেবী, পুত্র বীরেন্দ্রকুমার সেন, কন্যা কমলাদেবী বাচ্চি, অঞ্জলি জটুসহ বসবাস করতেন কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে। বসন্ত কুমার সেনের মৃত্যুর পর গিরিবালা দেবী তাঁর মেয়ে দুলিকে নিয়ে দেবর ইন্দ্রকুমার সেনের আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সময় নজরুল কুমিল্লায় বেড়াতে এসে ইন্দ্রকুমার সনের বাসায় আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। ইন্দ্রকুমার সেনের স্ত্রী বিয়জাসুন্দরী দেবীর মাতৃস্নেহে নজরুল অভিভূত হন। আর তাঁর পুত্র বীরেন্দ্রকুমার সেনের সাহচর্যে স্বদেশি আন্দোলনে হয়েছিলেন উজ্জীবিত। ইন্দ্রকুমার সেনের ছোট্ট মেয়ে কমলাদেবী বাচ্চি, অঞ্জলিদেবী জটু ও বড় ভাইয়ের মেয়ে আশালতা সেন দুলির গান শুনে বিমুগ্ধ হন কবি নজরুল। এমনিভাবে কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে বসবাসরত মানিকগঞ্জের ‘তেওতা’ গ্রামের সেন পরিবারের সঙ্গে কবি নজরুলের গড়ে ওঠে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। এই মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামের সেন পরিবারের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কবি নজরুল রচনা করেছেন কবিতা। কবির মন ছিল সহজ-সরল শিশুসুলভ। শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সহজেই কবির ভাব জমে উঠতো। এই সেন পরিবারের মাতৃসমা বিরজাসুন্দরী দেবীর ছোট্ট মেয়ে অঞ্জলি জটুর সঙ্গে ছিল কবির মধুর সম্পর্ক। জটুর সঙ্গে তার চিঠি আদান প্রদান হতো। জটু তখন ছয়-সাত বছরের বালিকা। জটুর কচি মনের কাঁচা হাতের আঁকাবাঁকা এবড়ো থেবড়ো অক্ষরে ভুল বানানে লেখা চিঠির প্রত্যুত্তর দেন কবি ছড়া-কবিতায়। কবি নজরুল শিশুসুলভ ভাষায় ছড়া ছন্দে ‘চিঠি’ নামক ছড়া-কবিতায় লিখেছেন: ‘লিখবে এবার লক্ষ্মী নাম ‘জটায়ু পক্ষী’। শীগগির আমি যাচ্ছি, তুই দুলি আর বাচ্চি রাখবি শিখে সব গান নৈলে ঠেঙিয়ে অজ্ঞান। ............ এখনো কি বাচ্চু খাচ্ছে জ্বরে খাপচু? ভাঙেনি দুলির ঠ্যাংটা রাখালু কি ন্যাংটা? ................. কবি নজরুলের মন-প্রাণ ছিল হাস্য-রসিকতায় ভরপুর। তিনি তাঁর লেখা কবিতায় ঠাট্টাচ্ছলে জটুকে ‘জটায়ু’, জন্টিয়া’ বলে সম্বোধন করেছেন। নজরুলের ‘চিঠি’ নামক ছড়া কবিতাটিতে উল্লেখিত ‘জটায়ু’ ও ‘বাচ্চু’ হলেন বিরজাসুন্দরী দেবীর মেয়ে অঞ্জলি দেবী জটু, কমলাদেবী বাচ্চি, ‘দুলি’ হলেন গিরিবালাদেবীর মেয়ে আশালতা সেন ওরফে দোলন দেবী দুলি। ‘রাখালু’ হলেন বীরেন্দ্রকুমার সেনের ছেলে প্রবীর কুমার সেন রাখাল (বর্তমান জীবিত), ‘রাঙাদা’ হলেন বীরেন্দ্র কুমার সেন, ‘বৌদি’ বীরেন্দ্রকুমার সেনের স্ত্রী কমলিনী দেবী, মা হলেন বিরজাসুন্দরী দেবী, ‘মাসিমা’ গিরিবালা দেবী আর ‘বাবা’ বলে উল্লেখ করেছেন ইন্দ্র কুমার সেনকে। চিঠি নামক কবিতার ‘জটু’কে কাঠবেড়ালির সঙ্গে একাকী কথা বলতে দেখে নজরুল লিখেছেন ‘খুকী ও কাঠবেড়ালি’ শীর্ষক কবিতা। বিরজাসুন্দরী দেবীর মেয়ে অমলাদেবী লিলি। এই মেয়েটি ছিলেন খুবই অভিমানী। কারও সঙ্গে কোন কথা বলতেন না। রোগে ভুগে এই মেয়েটি মারা যান। এই অভিমানী মেয়েটিকে নিয়ে মা বিরজাসুন্দরী দেবীর মনের বেদনার কথা নজরুল লিখেছেন ‘অভিমানী’ কবিতায়: ‘ওরে অভিমানিনী, এমনি করে বিদায় নিবি ভুলেও জানিনি। যাবার দিনে গোপন ব্যথা বিদায়-বাঁশীর সুরে কইতে গিয়ে উঠলো দু’চোখ নয়ন জলে পুরে! না-কওয়া তোর সেই যে বাণী, সেই হাসি-গান সেই মু’খানি হায়! আজো খুঁজি সকল ঠাঁই। তোর যাবার দিনে কেঁদে কেনো ফিরিয়ে আনিনি? ওরে অভিমানিনী। মাতৃভক্তিতে বিরজাসুন্দরী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন ‘হারাছেলের চিঠি’ নামক একটি ছোট গল্প। পত্রাকারে এই ‘হারাছেলের চিঠি’তে ফুটে উঠেছে মানিকগঞ্জের রূপ-সৌন্দর্য। কবি গদ্য কবিতার মত এই গল্পে লিখেছেন: ‘ও পারে মানিকগঞ্জের সীমানা সবুজ রেখায় আঁকা। এপারে ফরিদপুরের ঘন-বন-ছায়া।’ বিরজাসুন্দরী দেবীকে একটি সুন্দর কবিতায় উত্সর্গ করেন কবির কাব্যগ্রন্থ ‘সর্বহারা’। উত্সর্গপত্রে লিখেছেন: সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার। তুমি কোনোদিন কারো করনি বিচার, কারেও দাওনি দোষ। ব্যথা-বারিধির কূলে বসে কাঁদ মৌন কন্যা ধরণীর একাকিনী।........... কবি নজরুল মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামের বসন্ত কুমার সেনের একমাত্র আদুরে কন্যা আশালতা সেন ওরফে দোলন দেবী দুলিকে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল বিয়ে করেন। দুলি ছিল দোলনচাঁপা’র মত। কবি দুলিকে নিয়ে রচনা করেন ‘দোলচাঁপা’ নামে এক কাব্য। দুলি ছিলেন নজরুলের কাব্য প্রেরণার উত্স। দুলিকে নিয়ে কবি যেমনি রচনা করেছেন কাব্য-কবিতা, ঠিক তেমনি দুলির জন্মস্মৃতি গ্রাম ‘তেওতা’কে নিয়েও লিখেছেন কবিতা। কবির আদুরের ধন ‘সানি-নিনি’র মুখ জবানীতে ‘ছোট হিটলার’ কবিতায় মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকেছেন ‘তেওতা’র চিত্রগাঁথা: ‘মাগো আমি যুদ্ধে যাব নিষেধ কি মা আর মানি? রাত্তিরে রোজ ঘুমের মাঝে ডাকে পোলান্ড-জার্মানি। ভয় করি না-‘পোলিশ’দেরে জার্মানির ঐ ভাওতাকে, কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামা বাড়ি ‘তেওতা’কে। ............... কোল ন্যাওটা তোমার ‘নিনি’ তোমার নামে আধখানা তোমার ‘সানি’ যুদ্ধে যাবে মুখটি করে চাঁদপনা! কবি-জায়া দুলির জন্মভূমি মানিকগঞ্জের ‘তেওতা’ গ্রাম। যমুনার তীরে ছায়াবীথি ঘেরা এই গ্রামে কবির পদচারণায় জেগেছিল জাগরণ। কবি নজরুলের স্মৃতিধন্য ‘তেওতা’ গ্রামে প্রজাহিতৈষী জমিদার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, লেখক কিরণশঙ্কর রায় চৌধুরীর অরক্ষিত শিল্পনন্দিত প্রাসাদবাড়ি ঘিরে গড়ে উঠুক ‘নজরুল-প্রমীলা স্মৃতি জাদুঘর’ কিংবা একটি বিশ্ববিদ্যালয়। নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি অমর হোক এই প্রত্যাশা সকলের।