পাবনা শহরের দিলালপুরে আমার জন্ম। আমার শৈশব কৈশোরকাল একদিকে ছিল জরিমোড়া অন্যদিকে দুঃখে ভরা। মা-বাবা, নানা-নানী, ফুফুদের স্নেহ আদর যত্ন পেয়েছি অফুরান। কিন্তু আমার বড়ভাই শামীম খেলতে গিয়ে আম কাটা ছোট ছুরি বুকে বিঁধে মাত্র ১১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সে কষ্টে আমাদের শৈশব কৈশোরে কালো মেঘের ছায়া পড়ে।
আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। ‘সবুজ পাতা’ নামের কিশোর পত্রিকায়। প্রখ্যাত কথাশিল্পী শাহেদ আলী সম্পাদিত। লেখাটির নাম ‘এলো সবুজের ডাক’। পত্রিকায় নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখে আমার খুশি যেন পৃথিবী সমান হয়ে গিয়েছিল। সত্যি সেই সব দিনগুলো কৈশোরকাল রঙিন থেকে রঙিনতর করে দিতো।
আমার বাবা শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক প্রয়াত তাসাদ্দুক লোহানীর অনুপ্রেরণা আমাকে প্রভাবিত করে। তিনিই ছোটকালে আমার আদর্শ ব্যক্তিত্ব এবং এখনও। আমার মা বদরুনাহার লোহানী পরিণত বয়সে আমার বড়দের গল্পের মনোযোগী পাঠক ছিলেন। তিনি গল্প পড়ে আলোচনা-সমালোচনা সবই করতেন। মোটের ওপর খুশি হতেন।
আমি বড়দের জন্যে লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্যে লিখতে ভালোবাসি। আজ যারা শিশু-কিশোর, আগামীদিনে তারাই দেশ ও জাতি আশা ভরসা-বিবেক। সুতরাং ছোটদের জন্যে প্রয়োজন প্রচুর মানসিক পুষ্টি। শিশুসাহিত্য তার একটি প্রধান শাখা। আমাদের অগ্রণী শিশু-সাহিত্যিকদের করণীয় কচি-কাঁচাদের জন্যে দুই হাতে লেখা।
ছোটদের জন্যে লিখতে বসলে আবার ফিরে যেতে হয় ফেলে আসা কৈশোরে। নিজেকে হারিয়ে ফেলি তখন বাস্তব থেকে। কৈশোরের মৌ মৌ সৌরভে মন হয়ে ওঠে রঙিন-উচাটন। আমাদের ছোটবেলায় আমাদের বিনোদনে অনেকখানি জুড়ে ছিল ছোটদের পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি। তোমাদের মতো আধুনিক প্রযুক্তির এমন ছড়াছড়ি ছিল না। ঘুড়ি ওড়ানো, সার্কাস, বায়োস্কোপ, একটু বড় হলে টিভি আর রেডিও। এসবই ছিল আমাদের বিনোদন। অবশ্য মাঝে-মধ্যে পাড়ার অনুষ্ঠান খেলাধুলা, গান-নাটক এগুলোও বিনোদনের মধ্যেই পড়তো।
আমি প্রকৃতি খুব ভালোবাসি। ফুল-ফল, বৃক্ষলতাগুল্ম, পাখ-পাখালি, নীলাকাশ, জোছনারাত, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত-এ সবই আমাকে প্রবলভাবে টানে। বলা যায়, আমাকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। আমার লেখাগুলোয় তাই প্রকৃতির উপস্থিতি ঘটে বারবার। আমাদের শিশু-কিশোররা প্রকৃতি ভালোবাসুক। সবুজে ভরে উঠুক আমাদের প্রিয় শহর। তাতেই রয়েছে যথার্থ আনন্দ ও মঙ্গল।
আমার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা মোট ২৫টি।
এগুলোর মধ্যে শিশুতোষ বইগুলো হলো: ইস্টিকুটুম মিস্টিকুটুম, আরো ভূতের গল্প, এক যে আছে পিঁপড়ে, ওপেনটি বায়োস্কোপ,কুসুম ফোটার বেলা,গল্পের সাতনরী, এক-অদ্ভুতের গল্প, টাইগার, তুপুল ও টিফিন বক্সের গল্প, দাদুর ইজিচেয়ার, এক ডজন ভূতের গল্প, কিশোর সমগ্র, গল্প সমগ্র, আফতাব বুক হাউজ, কিশোর সমগ্র (২য় খণ্ড)
আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী প্রাপ্ত হই ১৯৭৬ সালে। বাংলা ভাষা আমার প্রাণের ভাষা।
আমি নতুন নতুন জায়গা, পরিবেশ ও মানুষ দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু সব সময় জায়গা নানা পিছুটানে হয়ে ওঠে না। এর মধ্যে আমি মাত্র কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছি। আর আমার প্রিয় মাতৃভূমির তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।
ছোটদের জন্য লেখা বেশ কঠিন। তবু আমি চেষ্টা চালিয়ে যাই। এ যুগের ছোটদের মেজাজ মর্জি বোঝা অতটা সরল নয়। আমাদের দেশের খ্যাতিমান শিশু সাহিত্যিকরা আরো বেশি-বেশি শিশু-সাহিত্য রচনা করে শিশু-সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করুন এই আমার আশা ও দাবি।
আমি এ যাবত্ যে কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছি তা হলো: অভিযাত্রিক পদক, ড. আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন পদক, কমর মুশতারী স্মৃতি পুরস্কার, বেগম সাজিদুন্নেসা খাতুন চৌধুরানী স্মারক সম্মাননা, জসিমউদদীন স্বর্ণপদক, লেখিকা সংঘ সাহিত্যপদক, নন্দিনী সাহিত্য পদক, রবীন্দ্র সম্মাননা—নবকল্লোল, পশ্চিমবঙ্গের উর্মি সাহিত্য পত্রিকাও একবার আমাকে সংবর্ধনা দেয়। আমি ছোটদের জন্য লিখতে বেশি আনন্দ পাই। ছোটরাইতো আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।
