কেউ পারুক আর না পারুক গান গাইতেই হবে। কমপক্ষে পারভেজ ভাইয়ের মতো বেসুরা গলায় গান আর কবিতার সংমিশ্রণে গাবিতা হলেও গাইতে হবে। এমনি ভাবে নাছোড়বান্দার মতো জেদ ধরে বসলেন রোকন ভাই। কি আর করা একে একে ১৪ জনকেই গান আবৃত্তি করতে হলো। তবে রনি ভাই আর বাসেত ভাইয়ের গলা থেকে গান বের করতে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়। তাছাড়া শব্দের মাধ্যমে গানের প্রতিযোগিতা, কৌতুক, কবিতা আর ফাঁকে ফাঁকে চকলেট ও ম্যাংগোবারের মাধ্যমে পুরো রাত পার হয়ে যায় গাড়িতে। ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার দৃশ্যটা ছিল এমনই মজাদার।
পরদিন সকালে বান্দরবান শহরে নেমে একটি হোটেলে উঠে কাজা ঘুম পূরণের প্রতিযোগিতা শুরু হলো। নাস্তা সেরে আমাদের প্রথম দর্শনস্থল নীলগিরি। চাঁন্দের গাড়ি ঠিক করা হলো, তবে চাঁদ নামের পৃথিবীর কোনো উপগ্রহতে যাওয়ার জন্য নয়। এটি পাহাড়ের ঢালু রাস্তা বেয়ে চূড়ায় উঠার জন্য বহুল ব্যবহূত। পাহাড় কেটে রাস্তা বেয়ে আমরা এগুচ্ছি। গাড়ির শব্দ আর আমাদের ভাঙ্গা গলার গানের শব্দ মিলে এক অসাধারণ মিউজিকের অনুভূতি পাচ্ছি। রাস্তায় মাঝে-মাঝে আর্মিদের চেক পোস্ট দেখে মনে হচ্ছে আমরা কোনো সেনা ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা পর হঠাত্ ইসমাইল ভাই বলে উঠল ‘ওয়াও ওয়াও মোরা পাহাড়ে উপর আইচি’।
আমরা নীলগিরির চূড়ায়। দৃষ্টি সীমা যতদূর যায় সবুজ পাহাড়ের উপর সাদা মেঘ কাশফুলের মতো ভেসে আছে। মনে হচ্ছে সবুজ গালিচার উপর সৃষ্টিকর্তা নিখুঁত ভাবে রং তুলি দিয়ে তার অদৃশ্য হাতের স্পর্শ ছুঁয়ে দিয়েছেন। একটু পরই মশিউর ভাই বলল, ক্যামেরা রেডি করো। এর পর পরই শুরু হলো সবার ছবি তোলার নীরব প্রতিযোগিতা।
প্রকৃতির সৌন্দর্য গিলতে গিলতে পেটের ক্ষুধা মলিন হয়ে গেছে। নীলগিরি থেকে ফেরার পথে চম্বুকের মতো পাহাড়ের চূড়ায় টানল চিম্বুক পাহাড়। সেখানে উঠেই আদনান ভাইয়ে কথা মনে পড়ল। গাড়িতে আসতে তার গলার ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে... দূর অজানায় যায় হারিয়ে’ মনে করিয়ে দিল সোহেল ভাই আর নূরুন্নবী ভাইকে। তারা আর সেখান থেকে নামবেই না। হারিয়ে যেতে চায় মেঘের সাথে। কিন্তু আমরা হারাতে দেইনি।
বান্দরবান শহরে এসে দুপুরের খাবার পর আমরা গেলাম মেঘলায়। ঝুলন্ত সেতুর উপর সবাই উঠছে, কিন্তু কাদের ভাই পিছনে। বুঝলাম তিনি একটু ভয় ভয় করে হাঁটছেন, তার সন্দেহ কাঠের সেতু যদি ভেঙ্গে পড়ে! কিন্তু এখানে এসে নাজমুল ভাইকে একটু নীরব দেখলাম। মনে হয় এ সৌন্দর্যের মাঝে প্রিয়জনকে মিস করছেন। তবে সাব্বির ভাইকে বেশি উত্সুক মনে হয়েছে। পরে জানলাম সেখানে পাহাড়ি ফল খেয়ে এনার্জি সঞ্চয়ই ছিল তার কারণ। আমরা রওনা হলাম নীলাচলের দিকে। তার পর সবাই ইচ্ছানুযায়ী বান্দরবান শহর থেকে কেনা কাটা করে সোজা হোটেল। সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য আবার গাড়িতে বসা।
কিছুক্ষণ পর দেখি সবাই বার্মিজ আচার ও চকলেট খাচ্ছে। এতো আচার ও চকলেট কিনল কে? খোঁজ নিয়ে জানলাম এতক্ষণ যিনি নীরবে আমাদের গাইড করে এসেছেন সেই রুবেল ভাই। যার ইচ্ছা খুব শিঘ্রই প্রিয়জনকে নিয়ে আবার বান্দরবান ঘুরে আসার। এ ইচ্ছা আমাদের সকলের। এখনও বান্দরবান আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
