নেদারল্যান্ডে চালু হলো স্টিভ জবস-এর স্বপ্নের স্কুল

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:২৩
প্রযুক্তি বিশ্বের প্রবাদ পুরুষ, অ্যাপল’র স্বপ্নদ্রষ্টা স্টিভ জবসকে কেউ কেউ সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। তার ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি একদিকে যেমন ম্যাকিন্টোশ সিস্টেম দিয়ে পার্সোনাল কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছেন; তেমনি পরবর্তী সময়ে আইপড, আইফোন, আইপ্যাডের মতো যুগান্তকারী সব ডিভাইস দিয়ে মাতিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকে। এসব ডিভাইস প্রযুক্তি বিশ্বে বলতে গেলে নতুন এক যুগের সূচনা করতে সক্ষম হয়। তবে স্টিভ জবস কেবল নতুন নতুন পণ্য আর প্রযুক্তি উদ্ভাবন নিয়েই থেমে থাকেননি, প্রযুক্তিকে কী করে মানুষের দৈনন্দিন কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়েও ছিল তার আগ্রহ। আর তাই বোধহয় তিনি সারাবিশ্বের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল এক পরিবর্তনের কথা ভাবতে পেরেছিলেন। স্টিভ জবস এমন এক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন, যেখানে থাকবে না কোনো ছাপানো বই কিংবা খাতা; প্রয়োজন হবে না কলম কিংবা পেন্সিল। পড়ালেখার পুরোটাই সম্পন্ন হবে প্রযুক্তি পণ্যের সহায়তায়, নির্দিষ্ট করে বললে আইপ্যাডের মাধ্যমে। হ্যাঁ, আজকাল ডিজিটাল ক্লাসরুম নিয়ে কথা হলেও কেবল আইপ্যাড দিয়েই একটি ক্লাসরুমের সব ধরনের কাজের পরিকল্পনা করেছিলেন এই কিংবদন্তি। জীবদ্দশায় তার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন না করতে পারলেও এবারে নেদারল্যান্ডে তার এই পরিকল্পনার স্কুল ঠিকই চালু হয়ে গেছে। সম্প্রতি সেখানকার সাতটি বড় শহরে এমন সাতটি স্কুল যাত্রা শুরু করেছে। ‘দ্য এডুকেশন ফর আ নিউ এরা ফাউন্ডেশন (O4NT)’ নামের একটি ফাউন্ডেশন এই স্কুলগুলো চালু করেছে। আর স্কুলগুলোর নামের সাথেও তারা জাড়িয়ে দিয়েছে এর স্বপ্নদ্রষ্টা স্টিভ জবসকে। প্রথম সাতটি স্কুল যে শহরগুলোতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেগুলো হলো স্নিক, ব্রেডা, আলমিয়ার, ইমমেন, হিনভ্লিয়েট এবং আমস্টারডাম। স্কুলগুলোর মধ্যে স্নিকের স্কুলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাস্টার স্টিভ জবস স্কুল’ এবং ব্রেডার স্কুলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্টিভ জবস স্কুল ব্রেডা’। এই দুইটি স্কুলেই সব ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে আইপ্যাডনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম। বাকি পাঁচটি স্কুলে প্রাথমিকভাবে নিচের ক্লাসগুলোতে চালু করা হয়েছে আইপ্যাডনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম এবং ক্রমান্বয়ে উপরের ক্লাসগুলোতেও একই ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে। প্রকল্পটির পেছনে কাজ করা ফাউন্ডেশনটি জানিয়েছে, নেদারল্যান্ড সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবার কাছে শিক্ষাকে সহজলভ্য করে তুলতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সহায়তা করবে এই উদ্যোগ। আর সেই লক্ষ্য স্টিভ জবস স্কুলের মাধ্যমে অর্জন করাও অনেক সহজ হবে। O4NT এই স্কুলের জন্য যে সিস্টেম অনুসরণ করছে, তাতে আইপ্যাডের জন্য রয়েছে একগুচ্ছ অ্যাপ্লিকেশনের একটি ভাণ্ডার। এসব অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে ভার্চুয়াল স্কুল আঙিনা থেকে শুরু করে রয়েছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য স্টুডেন্ট ট্র্যাকার, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর পড়ালেখার অগ্রগতি মনিটরিং সম্ভব। অবশ্য এসব স্কুলে শিক্ষককে বলা হচ্ছে ‘কোচ’। কেবল পাঠ প্রদানই নয়, একজন শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে এবং দলগতভাবে গড়ে তোলার জন্য সব ধরনের সহায়তাই মিলবে এই কোচের কাছ থেকে। সাধারণভাবে একটি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন ধারার এই স্কুলগুলোতে অবশ্য ভার্চুয়াল জগতে এই কাজটি হতে পারে। এর জন্য রয়েছে ‘এস কুল স্পেস’ নামের একটি অ্যাপ্লিকেশন, যাতে প্রতিটি স্কুলের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা স্পেস এবং এখানেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলে একত্রিত হতে পারবে ভার্চুয়াল জগতে। এখানে প্রতিটি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা অ্যাভাটার এবং তারা অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে যে যেখানেই থাকুক না কেন, একসাথেই বসে রয়েছে বলে অনুভব করতে পারবে। তবে ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এটা মনে করার কারণ নেই যে এখানে বাস্তবে স্কুলের কোনো অস্তিত্ব নেই। স্কুলও রয়েছে, রয়েছে ক্লাসরুমও। প্রতিটি শিক্ষার্থীই তার নিজের সুবিধা অনুযায়ী আগে থেকেই তার ক্লাসের শিডিউল তৈরি করে রাখতে পারবে আইপ্যাডের অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে। আর তারপর স্কুলে গিয়ে পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ীই গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান কিংবা অন্য কোনো ক্লাসে ক্লাস করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অগ্রগতি জানার জন্য এই সিস্টেমে রয়েছে ‘আইডেস্ক লার্নিং ট্র্যাকার’। কোন শিক্ষার্থী কোন অ্যাপ্লিকেশনে কতটুকু সময় ব্যয় করছে, কোন অ্যাপ্লিকেশনের পাঠে কোন স্তর অতিক্রম করছে, কোন স্তরে গিয়ে তার বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন—এসবই মনিটর করা যায় এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে। আবার অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো একজন শিক্ষার্থীর অগ্রগতির তুলনাও করা যায় এর মাধ্যমে। এ রকম হাজারো অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে এই অভিনব স্কুলগুলো। O4NT জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে মোট ১২টি স্কুল চালু করবে তারা। আর সামনের বছরে ডাচ ভাষাভাষী সকলেই যেকোনো স্থান থেকে এই স্কুলে পড়ার সুযোগ লাভ করবে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ডিজিটাল ধারা তৈরি হয়েছে, তাতে এটি একটি যুগান্তকারী সংযোজন।