শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৫
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শিক্ষা মেলা আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সরশিপের নামে বিপুল অংকের টাকা ‘চাঁদাবাজির সুযোগ করে দিয়ে’ চিঠি লিখে ফেসে যাচ্ছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংশ্লিষ্ট ফাইল ঘেঁটে দেখেন, যে চিঠি ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লেখা হয়েছে, তার সাথে মন্ত্রীর অনুমোদিত ফাইলের মিল নেই। ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত মন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার বললেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে চাঁদাবাজির সুযোগ করে দেয়ায় মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি নিয়ে ‘এডুকেশন এক্সপো’ আয়োজনের নামে এইম ওয়ার্ল্ডওয়াইড নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদাবাজি করছে এমন অভিযোগ এসেছে মন্ত্রণালয়ের কাছে। মেলায় অংশ নিতে সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজকে ওই চিঠিতে নির্দেশ দেয়া হয়। আবার মন্ত্রণালয়ের এই চিঠির আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এডুকেশন এক্সপো আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানটিকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়। এই দুই চিঠি ব্যবহার করেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোটা অংকের অর্থ দাবি করা হচ্ছে । সূত্র মতে, আগামী ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে এই শিক্ষা মেলা আয়োজনের কথা রয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইত্তেফাককে জানিয়েছে, এইম ওয়ার্ল্ডওয়াইড নামের প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে এসে বলেছে, এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠান। তাই এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে, বিভিন্ন স্পন্সরের নামে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ফি ধার্য করা হয়। মেলায় প্রধান অতিথি হিসাবে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ রয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এইম ওয়ার্ল্ডওয়াইড কৌশলে কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে থেকে কিছুদিন আগে একটি চিঠি তৈরি করিয়ে নেয়। মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত চিঠিতে ‘এডুকেশন এক্সপো’ করার জন্য শুধু অনাপত্তি নয়, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ওই মেলায় অংশ নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসচিব-এর কাছে একটি অনুলিপি দেয়া হয়, যাতে মেডিকেল কলেজগুলোকে অংশ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, আয়োজক প্রতিষ্ঠানটি তার আমন্ত্রণপত্রসহ সব কাগজপত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কে সহযোগী আয়োজক হিসেবে দেখিয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘চিঠিতে যে ভাষা লেখা হয়েছে তাতে আমার অনুমোদন নেয়া হয়নি।’ তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা এসব কাজ করেছেন। কে এবং কোন উদ্দেশ্যে এভাবে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নির্দেশ দিল তা খতিয়ে দেখা হবে। চাঁদা আদায় করে যে এডুকেশন এক্সপো করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে প্রয়োজনে সেটিও বন্ধ করে দেয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন মেলায় কাউকে অংশগ্রহণের জন্য নির্দেশনা দিতে পারি না। যা হয়েছে তাতে আমি বিস্মিত। উক্ত মেলায় আমাদের সহযোগী আয়োজক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।’ শিক্ষামন্ত্রী গতকাল এ বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং সংশ্লিষ্ট শাখার যুগ্ম সচিবকে তার কক্ষে ডেকে আনেন। ভারপ্রাপ্ত সচিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘মেলায় প্রধান অতিথি হিসাবে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে মাননীয় স্পিকারের সাথেও কথা বলবেন। আমরা চাই না এভাবে চাঁদাবাজি করে কেউ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইমেজ নষ্ট করুক। আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে এইম ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের চেয়ারম্যান মিঠুন মোস্তাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, এই মেলার মাধ্যমে সরকারের শিক্ষাখাতে অর্জন তুলে ধরা হবে। এ কারণে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের জন্য চিঠি লিখেছে। তবে এখন কেন এই চিঠির বিষয় শিক্ষামন্ত্রী অস্বীকার করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মিঠুন মোস্তাফিজ বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি বলেন, মেলার মতো ভালো উদ্যোগ নিয়ে এভাবে সমালোচনা হলে কিছুই করার নেই। উদ্যোগ থেকে সরে আসবো। একটি স্পন্সরের জন্য ৭০ লাখ থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এভাবে বড় অংকের টাকার জন্য প্রস্তাব দেয়া বিষয়ে তিনি বলেন, এতবড় অনুষ্ঠানের জন্য টাইটেল স্পন্সর ৭০ লাখ টাকা খুব বেশি নয়। এছাড়া অন্যান্য স্পন্সরের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এটা কমানো যাবে। চাঁদাবাজির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, টাকার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন টাকা পাইনি।