গণমানুষের প্রিয় কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী গভীর শ্রদ্ধায়, হূদয়ের উষ্ণতায় স্মরণ করলো পুরো জাতি। নজরুলের বৈচিত্র্যময় সুর-ঐশ্বর্যের সম্মোহন আর অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাণী উচ্চারণে মুখর ছিল প্রতিটি অনুষ্ঠান মঞ্চ। সাম্যবাদী ও দ্রোহী চেতনার ধারক নজরুল স্মরণে গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার জীবনবোধ শিল্পীরা গানে, কবিতায় ফুটিয়ে তোলেন। এসব অনুষ্ঠানে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে নজরুল-সাহিত্য অনুপ্রেরণা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন নজরুল বিশেষজ্ঞরা। সেইসঙ্গে নজরুলের লেখা গান বিকৃত হওয়ার অভিযোগ এনে তা বন্ধে একটি নীতিমালা করার দাবি জানান তারা।
ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠনসহ সর্বস্তরের হাজারো মানুষ। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দলে দলে আসেন শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক-ছাত্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কবিপ্রেমীরা। কবি পরিবারের পক্ষ থেকে কবির নাতনি খিলখিল কাজীসহ অন্য সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন।
ভোরে ফজরের নামাজের পর থেকেই নানা আয়োজন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে ফজরের নামাজের পর কোরআনখানি শুরু হয়। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমিতি ও ছাত্র-ছাত্রীরা কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ করেন। পরে কবির সমাধিস্থলে ঢাবি উপাচার্যের সভাপতিত্বে ও বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিদ্দিকা মাহমুদার সঞ্চালনায় কবির দর্শন ও জীবনের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সাহারা খাতুন ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, নজরুল একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী, শিল্পকলা একাডেমী, নজরুল আবৃত্তি পরিষদ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন।
জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে নজরুল ইন্সটিটিউটের নজরুল সম্মেলনের তৃতীয় ও সমাপনী দিনে ছিল আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচনায় অংশ নেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক রশীদ হায়দার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য খিলখিল কাজী। সম্মানিত অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সফিকুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। সাংস্কৃতিক পর্বে একক কণ্ঠে গান শোনান খালিদ হোসেন, শাহীন সামাদ, খায়রুল আনাম শাকিল, ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদ, ইয়াকুব আলী খান, ইয়াসমীন মুশতারী ও খিলখিল কাজী। আবৃত্তি করেন মাহিদুল ইসলাম ও ঝর্ণা সরকার। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষাণার্থী শিল্পীবৃন্দ। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষণার্থী আবৃত্তি শিল্পীরা।
রাইটার্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘আমারে দেবোনা ভুলিতে’ শীর্ষক শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান ও কবি সম্মেলনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে ‘নজরুল সম্মাননা’য় ভূষিত করা হয় শিল্পী বুলবুল মহলানবীশকে। ‘নজরুলের ইসলামী গান ও ভক্তিগীতি’ গ্রন্থের গবেষক শিল্পী মোস্তারী পারভীন টিনাকে দেয়া হয় ‘তরুণ নজরুল গবেষক-স্বপ্না রায় স্মৃতি পুরস্কার’। দুইজনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ এবং কবি-অধ্যাপক ড. খালেদ হোসাইন। অনুষ্ঠানে ‘নজরুলের গণসঙ্গীত’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা দেন ড. আনু মাহমুদ। আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. রশীদুন্নবী, মওলা প্রিন্স, ড. প্রদীপ কুমার নন্দী প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন রাইটার্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. আবুল আজাদ। দ্বিতীয় পর্বে ‘আমারে দেবোনা ভুলিতে’ শীর্ষক সঙ্গীতানুষ্ঠানে নজরুলের বিভিন্ন পর্যায়ের গান পরিবেশন করেন শরীফ আশরাফউজ্জামান ও মোস্তারী পারভীন টিনা। দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আলোচনাসভার আয়োজন করে। এতে সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এটিএম শামসুজ্জামানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, মোবারক আলী শিকদার, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ইনামুল হক, খায়রুল আলম সবুজ প্রমুখ।
