সাভারের আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রকাশ্যে চলে চাঁদাবাজি, ইয়াবাসহ মাদক ও অস্ত্রের বাণিজ্য। স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নামধারী এক শ্রেণীর নেতা ঐ সকল চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। চারদলীয় জোট সরকার আমলে যুবদল ও ছাত্রদল ঐ এলাকার মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও জাল জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণ করতো। বর্তমানে আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং জমি দখল বাণিজ্য প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের নামে চাঁদাবাজি, মাদক ও ভূমি দখল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন সবসময় ব্যর্থতার পরিচয়ে দিয়ে আসছে।
এদিকে আমিনবাজার ব্যবসায়ি সমিতি চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ মিছিল করছে গত ২ দিন ধরে। এ চাঁদাবাজির জন্য পুলিশকে দায়ী করেছেন ব্যবসায়িরা। তাদের দাবির মুখে গতকাল মঙ্গলবার আমিনবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ সকল পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ী এবং শিল্প কলকারখানা মালিক পক্ষ ইত্তেফাককে জানান, প্রতিটি সরকারের আমলে ঐ এলাকায় চাঁদাবাজি, কোটি কোটি টাকার মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং দখল বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা নামধারী এক শ্রেণীর সন্ত্রাসী। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন কতিপয় শীর্ষ নেতা। নিয়মিত চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র এবং দখলবাজি বাণিজ্যের ভাগ ঐ সকল শীর্ষ নেতার পকেটে যায়। এ কারণে সব সরকারের আমলেই স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতানামধারী বছরের পর বছর চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র ব্যবসা এবং দখলবাজি বিনা বাধায় করে আসছে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যুবদল ও ছাত্রদল এবং বর্তমানে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ঐ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। শুধুমাত্র নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটে। চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং দখল বাণিজ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। বরং নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদার হার বেড়ে যায় বলে জানান ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকগণ।
যে কারণে আমিনবাজার থেকে
পুলিশ প্রত্যাহার
জানা যায়, আমিনবাজার কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা প্রতি সপ্তাহে একদিন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের মাছ দিতেন। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। পুলিশকে বিনামূল্যে মাছ দেয়ার বিষয়টি নিয়মে পরিণত হয়। গত সোমবার সকালে আমিনবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য মাছ আনতে গেলে ব্যবসায়িরা আর বিনা টাকায় মাছ দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। পুলিশের সঙ্গে এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এক মাদক ব্যবসায়িকে গ্রেফতার করে। এ নিয়ে ব্যবসায়িদের সঙ্গে পুলিশের দ্বন্দ্ব বাঁধে। অপরদিকে পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। এরপর ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা নিয়ে এলাকায় প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, আমিন বাজার পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা সময়ে-অসময়ে মুদি-মনোহারি, কাঁচা-বাজার, মাংসের দোকান, ডির্পাটমেন্টাল ষ্টোর, বিপণি বিতান এমনকি ফুটপাতের দোকানিদের কাছ থেকে মালামাল ও জিনিসপত্র নিলেও কখনও টাকা পরিশোধ করে না। তাদের কাছে টাকা দাবি করলে তারা ভয়ভীতি দেখায়। পাশাপাশি হুমকি দেয় নির্যাতনের। দিনদিন পুলিশের এই অনৈতিক চাহিদা বেড়েই চলছে। সমস্যার নিরসনে ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আর্কষণ এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা আমিন বাজার পুলিশ ফাঁড়ির চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা । এ সময় কাঁচা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাথে যোগ দেয় স্থানীয় পরিবহন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তফা কামাল জানান, ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছিলেন। তিনি বলেন, সড়কের দুই ধারে অবৈধ দোকানপাট উঠাতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে। তিনি বিষয়টি তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। বিকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃেপক্ষের নির্দেশে ফাঁড়ির ইনচার্জ মো: লুত্ফুর রহমানকে ফাঁড়ি থেকে সাভার থানায় স্থানান্তর করা হয়। গতকাল ফাঁড়ি থেকে বাকি সকল সদস্যদেরও প্রত্যাহার করা হয়।
আমিন বাজারে মাদক ও অস্ত্রের
বৃহত্ চালান নিয়মিত আসে
সীমান্ত থেকে এক শ্রেণির কাভার্ড ভ্যান, নাইটকোচ, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনযোগে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ মাদক বস্তায় বস্তায় প্রতিরাতে আসছে আমিন বাজারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, আমিন বাজার দেশের সর্ববৃহত্ মাদকের স্পট। সীমান্ত থেকে নিয়মিত কোটি কোটি টাকার মাদক ও অস্ত্রের চালান আসছে ঐ স্পটে। এখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। এক যুগে আমিন বাজার এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রায় ৩০ জন খুন হয়েছেন। এখন সেখানে ইয়াবা বেচাকেনা চলছে মাত্রাতিরিক্ত। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক শ্রেণির নেতা স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এবং মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ দায়িত্বশীল কতিপয় ব্যক্তি ঐ মাদক ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকার ভাগ নিয়মিত পেয়ে থাকেন।
রাস্তার দুই পাশে মিল কারখানায়
যেভাবে চাঁদাবাজি চলে
আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত শতাধিক গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা রয়েছে। ঐ সকল মিল কারখানার মালিকদের কাছ থেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নামধারী একশ্রেণীর নেতা নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করে থাকেন। ২/১ মাস পর পর চাঁদার রেট বাড়ান ঐ সকল নেতারা। হেমায়েতপুরে এক নেতা অফিস খুলেছেন শুধু চাঁদা আদায়ের জন্য। আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে যুবলীগের ঐ নেতার অফিসে গিয়ে ভাগাভাগি করা হয়। এসকল নেতার অধিকাংশ যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারে দলীয় নেতা সেজে যান। আসলে এরা কোন দলের নয়। পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, আসলে আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশ চরম ব্যর্থ।
পুলিশ সুপার (ঢাকা) হাবিবুর রহমান বলেন, আমিনবাজারসহ আশপাশে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।
