বন ঝুমকোর রূপকথা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৭
সুন্দরবনের কাছাকাছি ছোট্ট এক গ্রামের প্রান্তে ঝোপ-জঙ্গলে ভরা একটা পরিত্যক্ত ভিটা। দিনের বেলায়ও জায়গাটা কেউ মাড়াতে সাহস পায় না। ভূত নাকি গিজগিজ করে! ভূত-পেত্নী ছাড়াও আছে নানা রকম সাপ; কিন্তু গ্রামের দস্যি ছেলেগুলো যখন এক জোট হয়, তখন তাদের ভয় দেখাতে পারে এমন ভূত-পেত্নী বা সাপ দুনিয়ায় নেই। জায়গাটা দস্যি ছেলেগুলোর ভারি পছন্দের। শিয়া কূল, বইচি, জাম, বন শসার লোভ তো আছেই, সঙ্গে আছে ‘ভূতের জাউ’। সেই ‘ভূতের জাউয়ের’ আকর্ষণই তাদের কাছে সব চেয়ে বেশি। দস্যি ছেলেগুলোর কাছে যা ‘ভূতের জাউ’ গ্রামের বড়দের কাছে সেটাই বন ঝুমকো বা জংলি ঝুমকো (বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora foetida)। জংলি ঝুমকো ফুল দেখতে ভারি সুন্দর। এত সুন্দর ফুল বন-জঙ্গলে ফুটতে পারে তা বিশ্বাস হতে চায় না। দেখতে অনেকটা আমাদের পরিচিত ঝুমকো লতার ফুলের মতো। হাল্কা বেগুনি মেশানো সাদা পাপড়ি। সংখ্যায় দশটি। পাঁচটি পরাগধানী কলসির মতো একটা গর্ভদণ্ডের ওপর বসানো। গর্ভমুণ্ডটি আবার তিন ভাগে বিভক্ত। গর্ভদণ্ডটির একেবারে গোড়ার দিকটা ঘিরে রয়েছে গাঢ় বেগুনি আর সাদা রঙের চক্রাকৃতির করোনা। ঝুমকো লতা এত সুন্দর দেখতে বলে লোকে শখ করে তাদের বাগানে লাগায়। গ্রামে অনেক বাড়ির বাইরের ফটকে ঝুমকো লতা দুলতে দেখা যায়। ঝুমকো লতা মন কেড়েছে কবিদেরও। রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি অংশ এরকম : ‘হঠাত্ কিসের মন্ত্র এসে/ ভুলিয়ে দিলে এক নিমেষে/ বাদল বেলার কথা,/ হারিয়ে পাওয়া আলোটিরে/ নাচায় ডালে ফিরে ফিরে/ ঝুমকো ফুলের লতা।’ রবীন্দ্রনাথের ‘শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে’ গানখানির এক জায়গায় আছে, ‘সইবে না সে পাতায় ঘাসে চঞ্চলতা, তাই তো আপন রঙ ঘুচাল ঝুমকো লতা। লর্ড আলফ্রেড টেনিসনের কবিতায় আছে, ‘“There has fallen a splendid tear/From the passion-flower at the gate./She is coming, my dove, my dear;/She is coming, my life, my fate.” ঝুমকো লতার ফুল আর জংলি ঝুমকো দেখতে প্রায় একই। তবে জংলি বা বন ঝুমকোর বিশেষত্ব হলো, এর ফল ভারী মনোলোভা। ইংরেজিতে একে বলে বুশ প্যাশন ফ্রুট। প্যাশন ফ্রুট এখন আমাদের দেশে পাওয়া যায়। যারা এই ফল চেখে দেখেছেন, তাদের পক্ষে বুশ প্যাশন ফ্রুট বা জংলি ঝুমকো ফলের ধারণা পাওয়া সহজ। চারদিকে জালের মতো ঘিরে থাকা ঘন মঞ্জরী-পত্রের মাঝে গোলাকৃতি ফল। খানিকটা লটকনের আকৃতির তবে খোসা পাতলা। একটু চাপ দিলেই ফেটে যায়। ভেতরটা ফাপা। ফল পাকলে কমলা বা লালচে কমলা বর্ণের হয়। ভেতরে কালো কালো অনেকগুলো বীজ। প্রতিটা বীজের চারদিকে অর্ধস্বচ্ছ রসাল আবরণ। বেশ মিষ্টি স্বাদ। ভালোমত পাকার আগে একটু টক টক ভাব থাকে তবে সেটাও খেতে বেশ মজার। সুন্দর গন্ধ আছে। শৈশব কৈশোরে এমন ফলের লোভ সামলানো বেশ কঠিন। বন-জঙ্গলেই জন্মে। কেউ যত্ন করে বাড়িতে লাগায় বলে শোনা যায় না। জংলি ঝুমকো আসলে লতা তবে কাণ্ড পুরানো হলে বেশ কাষ্ঠল হয়। লতা রোমশ। পাতা দেখতে অনেটা মিষ্টি আলুর পাতার মতো। আমাদের পরিচিত ঝুমকো ফুলের চেয়ে বন ঝুমকো আকৃতিতে খানিকটা ছোট। ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার ব্যাসের বেশি হয় না। ফুলের কুঁড়ি এবং ফলটা ঘন জালের মতো মঞ্জরী-পত্র এমনভাবে ঘিরে থাকে যে তা ভেদ করে পোকা-মাকড় সেগুলো নষ্ট করতে পারে না। কোন বেয়াড়া পোকা-মাকড় ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেও সেগুলো মঞ্জরী-পত্রের ভেতরই আটকা পড়ে। মঞ্জরী-পত্র তখন এক রকমের জারক রস দিয়ে সেগুলো হজম করে ফেলে। সে হিসাবে বন ঝুমকো আমিষাশী উদ্ভিদ বটে। স্যাঁতসেঁতে মাটিতে ভালো জন্মে। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় অল্পস্বল্প জন্মালেও পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশ ছাড়া ভারত, মিয়ানমার, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে পাওয়া যায়। ভিয়েতনামে ঝুমকো লতার কচি ডগা তরকারি হিসাবে জনপ্রিয়। ভিয়েতনামের লোকজন এক কচি পাতা শুকিয়ে রাখে। কেউ অনিদ্রা রোগে ভুগলে এই শুকনো পাতা দিয়ে তারা ‘চা বানিয়ে’ পান করে। এর মূল আলসার, মলদ্বার ফোলা চিকিত্সায় ব্যবহার হয়। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।