মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে দুইশ বাংলাদেশি আটক

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৯
সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর হাতে প্রায় ২শ’ বাংলাদেশি আটক হয়েছে। সোমবার রাতে মিয়ানমার জলসীমায় সেদেশের নৌবাহিনীর হাতে এসব বাংলাদেশি ধরা পড়ে বলে বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মঙ্গলবার রাতে নিশ্চিত করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ২১ থেকে ২৫ আগস্ট সময়ের মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূল থেকে ছোট ছোট জেলে বোটে করে প্রায় দেড় হাজার বাংলাদেশি ও মিয়ানমার নাগরিক দেড়শ’ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত কয়েকটি বড় জাহাজে ওঠে। এর মধ্যে সাড়ে ৩শ’ লোকসহ একটি জাহাজ সোমবার রাতে মিয়ানমার জলসীমায় সেদেশের নৌ-বাহিনীর হাতে আটক হয়। ধরা পড়া জাহাজটি থাইল্যান্ডের বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেটি গত রবিবার চট্টগ্রাম গভীর নোঙ্গর ত্যাগ করে। মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর হাতে আটককৃতদের মধ্যে ২শ’ বাংলাদেশি এবং বাকীরা মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফস্থ ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর শফিকুর রহমান জানান, ঘটনাটি শুনেছি। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। মিয়ানমার পক্ষও বিজিবিকে কিছুই জানায়নি। তিনি জানান, মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করলে সাধারণত ২ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে দু’দেশের সীমান্ত চুক্তি অনুসারে দুর্যোগজনিত কারণে ‘ভুলবশত’ অপর দেশে ঢুকে পড়া লোকদের আটক না করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তিনি আরো জানান, টেকনাফ উপকুল দিয়ে সাগরপথে যাতে কেউ মালয়েশিয়া যেতে না পারে সেজন্য বিজিবি সতর্ক রয়েছে। চলতি মাসে মাসে দেড় শতাধিক মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। প্রায় ২০ জন দালালের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরপরও মালয়েশিয়ায় মানব পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। একটি গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী কোন জাহাজে রোহিঙ্গা মুসলিম থাকলে সাধারণত মিয়ানমারের নৌ-বাহিনী তা আটক করে না। তবে জিম্মি করে টাকা আদায়ের পর থাইল্যান্ড জলসীমার দিকে ঠেলে দেয়। জানা যায়, গত এক দশক আগে মানবপাচারকারী রোহিঙ্গা দালালরা সাগরপথে মালয়েশিয়া গমনের জন্য বাংলাদেশ দিয়ে এই রুটটি চালু করে। দালালদের নেটওয়ার্ক বর্তমানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াতেও মানব পাচার হচ্ছে। কক্সবাজার উপকুল থেকে ট্রলারযোগে সরাসরি দক্ষিণ দিকে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড জলসীমা অতিক্রম করে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়া হয়। রোহিঙ্গা পরিচয় দিলে তাদের মালয়েশিয়া সরকার অবৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়। তবে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে অনেক সময় ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুরে ভীড়ে যায় ট্রলার। পূর্ব তিমুর থেকে ট্রলারযোগে যাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়া। তবে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর কোন নিশ্চয়তা নেই। সাগরপথে ট্রলারডুবির শিকার হয়ে প্রাণহানী, ট্রলার অকেজো হয়ে ভেসে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেলখাটাসহ নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবে চলতি বছর শতাধিক এবং গত বছর ২ শতাধিক মানুষ মারা গেছে। যার অধিকাংশই রোহিঙ্গা। তবে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে কয়েকশ’ বাংলাদেশি বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছে। জানা যায়, কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকুল দিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার রুটটি গত এক দশক আগে চালু হলেও গত ৬/৭ বছর ধরে মালয়েশিয়া গমনের ঘটনা বেশি ঘটছে। আর অস্ট্রেলিয়ার রুটটি চালু হয়েছে গত ৩ বছর ধরে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূ-খণ্ডে কোন শরণার্থীর ঠাঁই হয় না বলে জানান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও শরণার্থী সহায়তা বিষয়ক একটি সংস্থার কর্মকর্তা ডা. গিয়াসউদ্দিন। তিনি বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে অস্ট্রেলিয়া না যাওয়ার পরামর্শ দেন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার জানান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে মানব পাচারের জন্য শুধু কক্সবাজার জেলাতেই ২ শতাধিক দালাল রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন দালালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকী দালালদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।