হুজি থেকেই শুরু সব জঙ্গি সংগঠন

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০১
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গি কার্যক্রম এমনিতেই অনেকটা গুটিয়ে যায়। এরপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানের মুখে দাঁড়াতেই পারেনি জঙ্গি সংগঠনগুলো। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আবারও মাথা তোলার চেষ্টা করছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যত ব্যক্তি ধরা পড়েছে তাদের সবাই একই নেটওয়ার্কে জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছে। ১৯৯২ সালে আফগান ফেরত মুজাহিদদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সময় তারা হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি) নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে মাঠে নামে। এরপর থেকে শতাধিক জঙ্গি সংগঠন হলেও সবই কিন্তু হুজির আদর্শ নিয়ে মাঠে নামে। অনেক সময় এক সংগঠন ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠন তৈরি হয়। সব সংগঠনেরই নেতৃত্বে আফগান ফেরত মুজাহিদদের কেউ না কেউ ছিল। বর্তমানে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমেরও আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান (ফাঁসি কার্যকর হয়েছে)। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশে যেসব জঙ্গি কাজ করে তাদের মধ্যে একটা চেইন আছে। বিচ্ছিন্নভাবে নতুন কোন আদর্শ নিয়ে কেউ মাঠে নামেনি। সবার একটাই আদর্শ ‘সশস্ত্র বিপ্লবের’ মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা। এখন যারা দায়িত্বে আছেন তারা পূর্বসূরীদের অসম্পন্ন কাজ শেষ করতে চান। আবার উত্তরসূরীদের জন্য তারা নতুন কিছু কাজ রেখে যেতে চান, যা তারা পালন করবে। উদাহরণ দিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা যাদের ‘কোতল’ করতে চায় তাদের নাম ও পরিচয় দিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তারা বলেছে, ডাটাবেজে যাদের নাম থাকবে এর মধ্যে তারা যে ক’জনকে পারবে শেষ করে দেবে। আর যারা বাকি থাকবে তাদের শেষ করবে উত্তরসূরীরা। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের ৭ জন বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছে। এছাড়া আনসারুল্লাহ’র প্রধান নেতা মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানীকেও নতুন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তাকে টাস্ক ফোর্স ইন্টারোগেশন (টিআইএফ) সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটা সার্কেলের মতো কাজ করে জঙ্গিরা। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আবদুল আউয়াল, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের। এই ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় জঙ্গিদের একটি গ্রুপ। এছাড়া বিগত বিএনপি সরকারের সময় এই ফাঁসির রায় হওয়ায় তত্কালীন সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয় তারা। তাই বিএনপিকেও শতভাগ বিশ্বাস না করতে সহকর্মীদের বার্তাও পাঠিয়েছিল তারা। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো তাদের ব্যবহার করে পরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তাই কারো পক্ষে কাজ করার আগে চিন্তা করারও পরামর্শ পাওয়া যায় ওই নথি থেকে। বর্তমান সরকারের সময় তাদের কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করে তারা। তাই যে কোনভাবে এই সরকারকে ফেলে দেয়ার চিন্তাও ছিল তাদের। জিজ্ঞাসাবাদকারী একজন কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ সময়ে হেফাজতের সঙ্গে মিশে সরকারকে ‘উত্খাত’ করার চেষ্টাও করেছিল আনসারুল্লাহ। কিন্তু হেফাজতের শীর্ষ নেতারা তাদের কার্যক্রমে পুরোপুরি সায় দেননি। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেরাই নাশকতার ছক তৈরি করে। তার আগেই অবশ্য গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে যায় পুরো গ্রুপটি। গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আফগান ফেরত কয়েক হাজার মুজাহিদই আসলে জঙ্গিদের নেপথ্যে কাজ করছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে আলাদা সংগঠন হলেও তাদের নীতি বা আদর্শ এক। হুজি ভেঙেই গঠিত হয়েছিল জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন। কালের পরিক্রমায় পাওয়া গেল আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। পরবর্তীতে হয়তো নতুন কোন নামে তাদের আবার মাঠে দেখা যাবে। আনসারুল্লাহ’র দায়িত্বে থাকা মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানীও কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো নতুন কোন নাম দিয়ে একটি সংগঠন মাঠে দেখা যেত। তবে তাদের আদর্শ এক। যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ভৌগোলিক কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে পুরোপুরি জঙ্গিবাদ নির্মূল করা কঠিন। তারপরও নিয়মিত জঙ্গিদের এসব কার্যক্রম নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। যাতে হুট করে বড় কোন অঘটন তারা না ঘটাতে পারে। এখন অবশ্য জঙ্গিদের সেই পরিমাণ সামর্থ্যও নেই। তারপরও কোনভাবেই যাতে তারা সংগঠিত হতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।