আপনারা হজ্বের প্রকৃতি কি তা একবার উপলব্ধি করুন। ভালভাবে এবং পুরোপুরি জেনে নিন এবং সেই মোতাবেক নিজেকে প্রস্তুত করুন। তারই আলোকে এক এক কদম সামনে অগ্রসর হন, তাহলে একের পর এক বরকত ও নেয়ামতের দরজাগুলো আপনাদের জন্য খুলে যেতে থাকবে। হজ্ব কী? হজ্ব হচ্ছে আল্লাহকে মহব্বত করা এবং আল্লাহর মহব্বত লাভ করা। হজ্বের সফর মহব্বতের দাবি পুরো করার সফর। হজ্বের দাবি এবং পাওনা আল্লাহর মহব্বত ছাড়া কিছু নয়। এর প্রত্যেকটি আমল মহব্বতের আমল, এর প্রত্যেকটি মনজিল মহব্বতের মনজিল। মনে করবেন হজ্ব হচ্ছে— “আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে” পবিত্র কুরআনের একথার বাস্তব ও জীবন্ত নমুনা। দেখুন, আল্লাহ নিজের বান্দাদেরকে কত মহব্বত করেন। হুজুর (স.) এরশাদ করেন—পিতা-মাতার চেয়েও আল্লাহর মহব্বত বেশি। তাঁর রহমত এবং মহব্বতের কোন সীমা নেই। তাঁকে আল্লাহ বলে ডাকো অথবা রহমান বলে তা একই কথা। যেন আল্লাহ অর্থই রহমান। তিনি সারা দুনিয়াবাসীর ওপর তাঁর অফুরন্ত রহমতের বারি বর্ষণ করেই যাচ্ছেন। জগতের যেখানে যতটুকু রহমত দেখতে পাই তা তাঁরই রহমতের প্রতিবিম্ব। অথচ জগতের ওপর তা শতভাগের এক ভাগও নয় এবং এ এক ভাগও গণনা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। নিরানব্বই ভাগ রহমত তিনি রেখে দিয়েছেন পরকালে প্রদান করার জন্য। তাঁর রহমতের একটি নিদর্শন হলো তিনি আমাদেরকে কুরআন দান করেছেন যেন পরকালে তাঁর সেই রহমত আমরা লাভ করতে পারি। এই যে তিনি আমাদের ওপর তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেছেন এটাই আখেরাতে তাঁর রহমত পর্যন্ত পৌঁছার একমাত্র পথ। এটাও আমাদের প্রতি তাঁর মহব্বতের প্রমাণ। তাঁর দয়া এবং মেহেরবানী যে, তিনি আমাদের অন্তরে তাঁর ওপর আস্থা এবং ঈমান দান করেছেন, তাঁকে অন্তরের অলংকার বানিয়েছেন এবং প্রিয় করেছেন। তাঁর সাথে আমাদের যত মহব্বত আছে এবং হবে তা তিনি যে আমাদেরকে মহব্বত করেন তারই প্রমাণ। আল্লাহ পাক বলেন: “যারা ঈমানদার তারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি মহব্বত করে।” ঈমানের সমস্ত মিষ্টি, মজা এবং রং তাঁকে অনুরূপ মহব্বত করার মধ্যেই নিহিত। আর একটু চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহর থাকার জন্য কোন জায়গার প্রয়োজন নেই। সমস্ত জায়গা এবং মুহূর্তের মালিক তিনিই। সবই তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ। অথচ স্থান ও কালের কারাগারে বন্দী মানুষের প্রতি তাঁর কি অফুরন্ত ভালবাসা! একথার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে যে, তিনি বান্দাহকে মহব্বত করার জন্য এবং বান্দাহর মহব্বত লাভ করার জন্য মক্কার পানি ও তরুলতাহীন মরুভূমির একটা সাধারণ পাথরের তৈরি ঘরকে নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছেন, আর পূর্ব ও পশ্চিম তথা সারা দুনিয়ার মানুষকে সেখানে যাওয়ার জন্য ডাক দিয়েছেন। তিনি ডাক দিয়েছেন, আসো! সবকিছু ফেলে চলেন আসো! “লাব্বাইক, আল্লাহুমা লাব্বাইক” বলতে বলতে আসো! পাথরের তৈরি এই ঘরের কাছে আসো! স্থানের ঊর্ধ্বে যার অবস্থান তাঁর মহব্বত লাভ করার জন্য এই স্থানে আসো এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করো। এ ঘরের ভিতরে, এর দরজা ও দেয়ালের মধ্যে,তাঁর দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলোতে, তাঁর দিকে সফরের মধ্যে ইশারা ও মহব্বতের মাধ্যমে আন্তরিক প্রশান্তি ও স্বাদ লাভ করার যাবতীয় উপকরণ তিনি রেখে দিয়েছেন, যা একজন সত্যিকার প্রেমিকের মনে আশার সঞ্চার করে। আল্লাহতাআলা এমন একটা ঘরকে তাঁর মহব্বতের কেন্দ্র বানিয়েছেন যা বাহ্যত সকল সৌন্দর্য থেকে মুক্ত। অথচ কি বিস্ময়কর প্রেমই না তাঁর প্রতি সৃষ্টি করে রেখেছেন। এটাও তাঁর রহমত ও মহব্বতের একটা বড় প্রমাণ। এ ঘরকে তিনি উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন; একে স্বীয় বড়ত্ব ও মহত্বের প্রমাণ বানিয়েছেন; এখান থেকে তাঁর রহমত, বরকত, মহব্বত, হেদায়াত, অনুগ্রহ ও মর্যাদার এক স্থায়ী ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছেন। সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীর এক বিশাল ভান্ডারকে ভালোবাসা ও মহব্বতের রং দিয়ে রঙিন করেছেন এবং ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাকে খোদাই করে রেখেছেন। আল্লাহর ঘরের এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কোন সুন্দর দৃশ্য দেখলে এবং কোন সুস্বাদু বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করলে যে অনুভূতি জাগে তা লিখে প্রকাশ করা যায় না। অপরদিকে আল্লাহকে যারা চান আল্লাহ তাঁদের অন্তর-এ ঘরের মহব্বত দিয়ে ভরে দিয়েছেন। ফলে যারা এখানে আসতে অপারগ তারাও আশা এবং আকর্ষণ নিয়ে ছটফট করে থাকেন। অন্তত প্রতিদিন পাঁচবার উক্ত ঘরকে সামনে রেখে দাঁড়িয়ে ঘরের মালিকের নৈকট্য লাভ এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। একদিকে উচ্চতম ভালোবাসার বস্তু মাহবুবের বাড়ি; অন্যদিকে তাঁর প্রতি তাঁর প্রেমিকদের বুকভরা প্রেমের যে অব্যাহত ধারা আদিকাল থেকে চলে আসছে তা স্মরণ করলে যে কোন প্রেমিকের চিত্তকে ব্যাকুল করে তোলে এবং পৃথিবীর দিক-দিগন্ত থেকে ছুটে এসে তারা এ ঘরের পাশে ভিড় জমায়। এখন বিশেষ কথা হল, আপনারাও সেই ভিড়ের একটি অংশ ঘরের মালিক যাকে জিয়ারতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আমার আকাঙক্ষা হয় যেন আপনাদের অন্তরে এ মহব্বত জ্বলন্ত থাকে এবং আপনাদেরকে মাহবুবের বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান। এখন হজ্বের কাজ ও তা করার ক্ষেত্রগুলো দেখুন। যা আপনাদেরকে সম্পন্ন করতে হবে। এর পুরোটাই প্রেম ও ভালবাসার কাজ। এটাও আল্লাহর মহব্বতের প্রমাণ যে, তিনি উক্ত কাজগুলো কিভাবে করতে হবে শিক্ষা দিয়েছেন, তাকে ঘর জিয়ারতের অংশ বানিয়েছেন এবং তার ওপর ভালোবাসা ও বিনিময় প্রদানের সুসংবাদ দিয়েছেন। এটা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সুন্নতের উত্তরাধিকার। দেখুন, হযরত শাহ আবদুল আজিজ (রহ.) তার কি সুন্দর চিত্র অংকন করেছেন—হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে আদেশ করা হয়েছিল (এটা আপনাদেরকেও করা হয়েছে) যে, “বছরে একবার নিজেকে আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা রাখতে, তাঁরই ধ্যানে মশগুল থাকতে এবং প্রেমিকের তরীকা অবলম্বন করতে। আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে খালি পায়ে আলুথালু চুল নিয়ে হয়রান ও পেরেশান অবস্থায় হেজাজে পৌঁছে যাবে। ওখানে গিয়ে কখনও পাহাড়ের উপর উঠবে, কখনও ময়দানে দৌড়াবে, কখনও মাহবুবের ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। এক সময় ঘরের চারদিকে ঘুরবে এবং তার দেয়ালে চুম্বন করবে।” মহব্বত করা এবং মহব্বত পাওয়ার এ সমস্ত নিয়ম আল্লাহর রহমতই তোমাদের শিক্ষা দান করেছেন। এটাই সেই হজ্ব যার জন্য আপনারা রওয়ানা হবেন। আল্লাহ প্রেমের যে বিবরণ এ পর্যন্ত দেয়া হলো তা যদি মনে রাখতে পারেন, অন্তরে তার নকশা তৈরি করতে পারেন, আল্লাহর প্রেমের উষ্ণতা ও প্রশান্তি ধারণ করতে পারেন, অন্তর উজাড় করে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন, হজ্বের প্রত্যেকটা আমলকে প্রেমের রঙে রঞ্জিত করতে পারেন, এ সবকিছু দ্বারা কেবল তাঁর মহব্বত লাভ করার সন্ধানে থাকতে পারেন এবং কেবল তাঁরই মহব্বতের সাগরে অবগাহন করতে পারেন তাহলে হজ্বের কোল থেকে এমন পাক-পবিত্র হয়ে ফিরে আসবেন যেমন সন্তান মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসে। আর এভাবেই আল্লাহর নবী (স.)-এর সুসংবাদ পূর্ণ হবে আপনাদের জন্য। হজ্বের প্রতিটি কাজ এবং বায়তুল্লাহর প্রতিটি পাথর মহব্বত ও ভালবাসায় ভরপুর।
