নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) সঙ্গে চায় বিএনপি। এজন্য দল দুটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তাও হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের মধ্যেও ফোনালাপের পাশাপাশি সরাসরি আলাপও হয়েছে। আবার কখনও কখনও তারা প্রতিনিধির মাধ্যমেও যোগাযোগ ও বার্তা বিনিময় করছেন। এসব যোগাযোগে এরশাদকে জোটভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপি প্রধান। আর এরশাদ চাচ্ছেন ১৮ দলীয় জোট আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি করার নিশ্চয়তা দিক। তবে উভয় দলসূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া-এরশাদ কিংবা বিএনপি-জাপার আলোচনার ফল এখনো পর্যন্ত শূন্য।
জানা গেছে, এরশাদ মঙ্গলবার সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে রবিবার রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এসময় তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। খালেদা জিয়া তাকে নির্দলীয় সরকারের দাবির আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান, জবাবে এরশাদ বলেন, তিনি তার দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন। জাপা বিএনপির জোটসঙ্গী হলে এবং বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় গেলে কি পাওয়া যাবে, প্রায় ৩০ মিনিটের এই টেলিফোন আলাপে সেটিও জানতে চান এরশাদ। খালেদা জিয়াকে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ তাকে রাষ্ট্রপতি করার কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা রাখেনি। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তাদের জোটে যেতে তার আপত্তি নেই। সূত্রের দাবি, বিএনপি এরশাদকে এখনই সেই প্রতিশ্রুতি না দিলেও প্রত্যাখ্যানও করেনি।
তবে খালেদা জিয়ার সঙ্গে এরশাদের টেলিফোন আলাপের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। মির্জা ফখরুল গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেন ‘এটা সত্য, আমরা আমাদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম আরও জোরদার করতে এরশাদ ও তার দলকে সঙ্গে চাচ্ছি। এলক্ষ্যে জাপার বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের কথাবার্তা চলছে। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে এরশাদের টেলিফোনে কিংবা সরাসরি কোনো আলাপ হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’
রুহুল আমিন হাওলাদারও ইত্তেফাককে বলেন ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই। তবে যেহেতু সামনে নির্বাচন, সে কারণে এখন রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। অনেক সম্ভবও যেমন অসম্ভব হতে পারে, তেমিন অনেক অসম্ভবও নাটকীয়ভাবে সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তারপরেও সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পর জাপা চেয়ারম্যান নিশ্চয়ই বিষয়টির সত্যাসত্য নিয়ে কথা বলবেন।’ খালেদা জিয়ার সঙ্গে এরশাদের এবারের টেলিফোনে আলাপের বিষয়টি সম্পর্কে বিএনপি কিংবা জাপা থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, চলতি বছরের জুনে সিঙ্গাপুরে তাদের দু’জনের সরাসরি সাক্ষাতে আলোচনার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য তথ্য মিলেছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন ১৬ থেকে ২৫ জুন সিঙ্গাপুর অবস্থান করেন। এরশাদও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ১০ জুন সিঙ্গাপুর গিয়ে পূর্বনির্ধারিত সময়ের তিনদিন পরে অর্থাত্ ১৯ জুন দেশে ফেরেন। এসময় এরশাদের সঙ্গে তার স্ত্রী রওশন এরশাদও ছিলেন। সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুর অবস্থানকালে রওশনকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন এরশাদ। তাদের মধ্যে এক ঘণ্টারও বেশি সময় আলোচনা হয়। খালেদা জিয়া-এরশাদের এই সাক্ষাত্ নিয়ে তখন গণমাধ্যমে লেখালেখি হওয়ার পর দেশে ফিরে এরশাদ বলেছিলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) রাজনীতি করেন, আমিও রাজনীতি করি, আমরা কেউ কারও শত্রু নই। সুতরাং দেখা হলেও দোষের কী আছে।’
জানা গেছে, সিঙ্গাপুরে বৈঠককালেও রাষ্ট্রপতি করার শর্তে বিএনপির সঙ্গে যাওয়ার কথা বলেন এরশাদ। তখনও খালেদা জিয়া বিষয়টি প্রত্যাখ্যানও করেননি, আবার প্রতিশ্রুতিও দেননি, শুধু বলেছেন ‘দেখবো’।
একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনকে (পরবর্তীতে এ নির্বাচন হয়নি) সামনে রেখে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আশ্বাসে মহাজোটে যোগ দেন এরশাদ। আওয়ামী লীগ থেকে তখন এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বলে এরশাদ প্রকাশ্যে বহুবার দাবি করেছেন। ২০০৬ সালের শেষদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় বলে শোনা যায়। এর আগে ’৯৬ সালেও নির্বাচনের পরপর সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে এরশাদকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। এরশাদ তখন জেলবন্দী, জাপার কয়েক নেতা কারাগারে গিয়ে এরশাদকে বিএনপির প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছিলেন বলেও সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন স্থানে বলেছেন। এবারও এরশাদ বলছেন তাকে রাষ্ট্রপতি করার আগাম প্রতিশ্রুতি দেয়া হলে তিনি বিএনপির সঙ্গে যাবেন।
এই বিশ্লেষকদের মতে, এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করতে বাধা কোথায়? যেখানে প্রধান দুই দলই তাকে রাষ্ট্রপতি করার কথা গোপনে হলেও বলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এরপরেও তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে বাধার কারণ এমন হতে পারে যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ একে অপরকে ভালোভাবেই জানেন। এরশাদ তার শাসনামলে দুই নেত্রীকে নিয়ে যেমন রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করেছেন, তেমনি এরশাদ তাদের সঙ্গে ‘রাজনীতি’ও করেছেন। সুতরাং এখানে কেউ কারও অপরিচিত নন।
