চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ২৩:১৪
দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। কম গভীরতার কারণে জেটিতে মাদার ভেসেল আসতে না পারা, আমদানি পণ্য খালাসে বিলম্ব, খালাসের পর তা নির্বিঘ্নে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে না পারায় বন্দরের কর্মকাণ্ড গতি হারিয়ে ফেলে। ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে ভারত, নেপাল এবং ভুটানকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, দেশীয় আমদানিকারক এবং রপ্তানিকারকদের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামো সুবিধা যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহকে ট্রানজিট দেয়া হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। যদিও বন্দরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেছেন, ট্রানজিট দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ট্রানজিট দেয়ার পরও চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে যে অবকাঠামো সুবিধা রয়েছে তার ৩০ শতাংশ অব্যবহূত থাকবে। ট্রানজিটের লক্ষ্যে বন্দর প্রস্তুত উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা জানান, ভারতকে ট্রানজিট দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছানোর পর তা বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোটা দুরূহ হবে। এটি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১১ সালে একটি কোর কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি বন্দর থেকে কন্টেইনার পরিবহনে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। কিন্তু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না করার কারণে ট্রানজিট সুবিধার বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বন্দরে পণ্য আসার পর দ্রুত খালাস করার নিয়ম বিশ্বব্যাপী থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা পণ্য দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে পণ্য ভর্তি কন্টেইনারসহ অন্যান্য মালামালের স্তূপ জমে। বিশেষ করে রেলওয়ের মাধ্যমে কন্টেইনার ঢাকায় নিয়ে আসতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় উদ্যোক্তাদের নানামুখী সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। যেমন পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানি করা হলেও অনেকে রপ্তানি ডেটলাইন ধরতে পারেন না। আমদানি করা পণ্য ঢাকায় নিয়ে আসতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয় বিধায় আমদানিকারকদের ব্যাংকের বাড়তি সুদ গুণতে হয়। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় এ সমস্যা হয় বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। বন্দর থেকে সড়ক পথে কন্টেইনার ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুলও। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা ৯২ ভাগ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়। সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিবহন দ্রুততর ও সহজতর করা না গেলে বন্দর পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে পণ্য পরিবহনও অসম্ভব হয়ে পড়বে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ পৌঁছাতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি আসলেও বাল্ক পণ্য নিয়ে বিপুল সংখ্যক মাদার ভেসেল বহির্নোঙরে আসে। বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্যসমূহ বন্দরে নিয়ে আসা হয়। লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য সামগ্রী বন্দরে নিয়ে আসার জন্য আমদানি পণ্যের মূল্যের ওপর অতিরিক্ত মূল্য পড়ে। আগামীতে আরো বেশি ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি বন্দরে নিয়ে আসার উপায় খোঁজা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বন্দরের কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের মেয়াদে শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। অবশ্য প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ড্রেজিং ছাড়া অন্যান্য কাজ ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিটি), চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) কন্টেইনার সংরক্ষণ ক্ষমতা ৩২ হাজার টিইইউএস বলা হলেও বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার কন্টেইনার রাখা সম্ভব। আবার ২০১১ সালের ডিসেম্বরে কন্টেইনারসমূহের হ্যান্ডলিং বিষয়ক কন্টেইনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিটিএমএস) চালু হলেও পুরো পদ্ধতি আশানুরূপ কাজ না করায় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পুরো কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, লোডিং-আনলোডিংসহ সকল প্রকার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। প্রায় ৫ বছর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) কাজ সম্পন্ন হলেও এটি এখনও পূর্ণ মাত্রায় চালু হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের গত ২০০৮ সাল থেকে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এক লক্ষাধিক কন্টেইনার (টিইইউএস) বৃদ্ধি পেলেও ২০১১-২০১২ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং লক্ষাধিক সংখ্যক কমে গেছে। ২০০৮-২০০৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি ও রপ্তানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১১ লক্ষ ৮ হাজার ৫৬ টিইইউএস। ২০০৯-২০১০ সালে হ্যান্ডেলিং করে ১২ লক্ষ ১২ হাজার ৬৫২ টিইইউএস, ২০১০-২০১১ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ১৪ লক্ষ ৬৮ হাজার ৯১৪ টিইইউএস। কিন্তু ২০১১-২০১২ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ৪০৮ টিইইউএস। ওই বছর আমদানি কন্টেইনার এবং রপ্তানি কন্টেইনার উভয় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম ছিল। অভ্যন্তরীণ নৌপথে কন্টেইনার পরিবহনের জন্য ঢাকার পানগাঁও-এ ইতিমধ্যে একটি কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ কাজে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে ৩টি কন্টেইনার ভেসেল কেনা হচ্ছে। আগামী অক্টোবর মাসে পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনালের কাজ শুরু হবে বলে জানা যায়। এ ছাড়া কন্টেইনার সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়ার্ড নির্মাণ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, বন্দরের ১২৫ বছরের ইতিহাসের রেকর্ড ভঙ্গ করে গত দুইমাসে বন্দর সর্বোচ্চ সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ১৪ ভাগ। অথচ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শতকরা ৬ থেকে ৭ ভাগ। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা কার্যক্রম হিসেবে ভারত, নেপাল, ভুটানকে ট্রানজিট দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।