রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলের শৌচাগার স্বাস্থ্যসম্মত নয়!

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ২৩:২০
রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলের শৌচাগার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এগুলো সব সময় নোংরা, অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত থাকে। প্রাকৃতিক কাজ সেরে হাত ধোয়ার জন্য সাবানের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই অনেক নামি-দামি স্কুলে। ফলে শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্কুল চলাকালে শৌচাগার ব্যবহার করে না। আর যারা বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছে, তারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। তাদের মতে, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার ব্যবহারে মেয়েদের নানা রকমের ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়া কোষ্ঠ-কাঠিন্য ও গ্যাসের সমস্যাসহ মারাত্মক রোগ হওয়ার আশংকা থাকে। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তাদের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্কুল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ তদারকি করছে না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে লোকবল ও আর্থিক অসঙ্গতির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, তারা যথাযথ তদারকি করছেন। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। রাজধানীর বেশ কয়েকটি সরকারি, বেসরকারি ও মিশনারী বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা গেছে, স্কুল শৌচাগারগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, পুরানো প্যান ও কমোড, পিচ্ছিল মেঝে, অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীর তুলনায় শৌচাগার সংখ্যা কম। খুব কম সংখ্যক স্কুলেই শৌচারগার পরিষ্কারের জন্য ভালমানের জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফিনাইল ও ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মোঃ নূরুল আমিন-এর ছোট ছেলে আইডিয়াল স্কুলের মতিঝিল শাখায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। নূরুল আমিন বলেন, স্কুলের শৌচাগারগুলো বেশিরভাগ সময়ই ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। ভিকারুননিসা স্কুলের বসুন্ধরা শাখার প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা কেয়া চৌধুরী বলেন, সকাল সাড়ে সাতটায় ক্লাস শুরু হয়। এতো সকালে খুব কম সংখ্যক মেয়েই প্রাকৃতিক কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে পারে না। স্কুলে গিয়ে সে নোংরা শৌচাগারে যায় না। সাড়ে ১২ টায় স্কুল থেকেই কোচিং এ যায়, সব সেরে বিকেলে বাসায় এসে তাকে এই কাজ সমাপ্ত করতে হয়। একই স্কুলের বেইলী রোড শাখার অভিভাবক তাসমিমা বলেন, এত নামি স্কুল অথচ শৌচাগারে সাবান থাকে না। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রীর মা বলেন, মাসের বিশেষ সময়েও মেয়েরা শৌচাগার ব্যবহার করতে পারে না। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মায়াও স্কুলের শৌচাগার সব সময় নোংরা থাকে বলে অভিযোগ করেছেন। অভিভাবকদের সংগঠন ‘ভিকারুননিসা গার্ডিয়ান এসোসিয়েশন’র প্রেসিডেন্ট আনোয়ার হোসেন তৌফিক বলেন, বিষয়টি নিয়ে তারা স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে অনেকবার আলোচনা করেছেন, কিন্তু আজ অবধি অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে মেয়েদের শৌচাগার স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া খুবই জরুরি বলে তিনি মনে করেন। একই রকম অভিযোগ পুরানো ঢাকার একে জুবলি স্কুলের অভিভাবক লাডলি বেগম, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের ফারজানা আক্তার রিমি, বাংলা বাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আজমেরি বেগম, উদয়ন স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর মা পপি দাসের। জানা গেছে, এই সকল স্কুলের স্যুয়ারেজ লাইন পুরানো হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের একটি স্যুয়ারেজ লাইন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ কে জুবলি স্কুলের এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল এসএন রায় সামার বলেন, প্রায়ই তাদের স্যুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে শৌচাগার প্লাবিত হয়। তখন তাদের বাইরে থেকে সুইপার আনতে হয়। তবে তুলনামূলকভাবে মিশনারী স্কুলগুলোর শৌচাগারগুলো পরিষ্কার থাকে বলে জানালেন সেন্ট ফ্রান্সিস এন্ড জেভিয়ার্স স্কুল, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল ও সেন্ট জোসেফ হাইস্কুলের অভিভাবকগণ। এ বিষয়ে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল খালেক জানান, ১৯৯১ সালে ভর্তির চাপ এড়াতে ঢাকার ৬৪টি স্কুলে একই সাথে ডাবল শিফট চালু করা হয়। স্কুলের শিক্ষার্থী দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি শৌচাগার সংখ্যা। সকালে সুইপার শৌচাগার পরিষ্কার করার পর সোয়া ১২টা পর্যন্ত তা প্রভাতী শাখার শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করে। এরপর দিবা শাখার ক্লাস শুরু হওয়ায় শৌচাগার ভালভাবে পরিষ্কার করা যায় না। আইডিয়াল স্কুলের প্রিন্সিপাল ড. শাহান আরা বেগম শৌচাগার নোংরা থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করেছেন। শৌচাগারে কেন সাবান রাখা হয় না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবান রাখলে শিক্ষার্থীরা তা দিয়ে শৌচাগারের মেঝে পিচ্ছিল করে ফেলে। তাই দুর্ঘটনার ভয়ে তারা সাবান রাখেন না। এদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট শৌচাগার নেই বলে স্বীকার করেছেন ভিকারুননিসা বসুন্ধরা প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষিকা আশফিয়া সুলতানা। একই স্কুলের বেইলি রোড শাখার প্রধান শিক্ষিকা ফাতেমা নাসরিন বলেন, আগে যেখানে একজন সুইপার ৪০ জনকে সার্ভিস দিতো, এখন সে ১২০-১৩০ জনকে সার্ভিস দেয়। এছাড়া ফান্ডের অভাবে ১৮ হাজার ছাত্রীর জন্য সাবান রাখা সম্ভব হয় না। তবে তিনি মনে করেন, অভিভাবক এসোসিয়েশন সহযোগিতা করলে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব। তিনি স্কুলের পাশাপাশি শিশুদের বাড়িতেও শৌচাগার ব্যবহার শিক্ষা দেয়ার পরামর্শ দেন। সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ব্রাদার প্রদীপ প্লাস্টিড গোমেজ বলেন, ২ ঘণ্টা পর পর তারা শৌচাগার পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করেন। উদয়ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ড. উম্মে সালমা বেগম মনে করেন, স্কুল ছুটির পরেই কোচিং হওয়ায় তারা শৌচাগার পরিষ্কারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। চিকিত্সকের মতামত জাতীয় অধ্যাপক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম আর খান মনে করেন, প্রতি দশজন শিশুর জন্য একটি শৌচাগার থাকা উচিত। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এটা দুঃখজনক যে আমরা নামি-দামি স্কুলেও বাচ্চাদের স্বাভাবিক শৌচাগার সুবিধা দিতে পারছি না। তিনি বলেন, কারণ পায়খানা-প্রসাব চেপে রাখলে স্বাভাবিক নির্গমন নিয়ম ব্যাহত হয়, কোষ্ঠ-কাঠিন্য হয়, ক্ষুধা কমে যায় ও স্বাস্থ্যহানি ঘটে। পায়খানার পর সাবান দিয়ে হাত না ধোয়া হলে আমাশয়, ডায়রিয়া হয়। বাচ্চারা অনেক সময় পায়খানা চেপে রাখতে পারে না, তখন অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এতে তারা হীনমন্যতায় ভোগে। আশিয়ান মেডিক্যাল কলেজের প্রসূতি ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নাসিমা আক্তার বলেন, মেয়েদের ‘মিনিস্ট্রেশন’ কালে দীর্ঘ সময় একই প্যাড পরে থাকলে জরায়ুর নানা রকম ইনফেকশন হতে পারে। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে এবং সন্তান ধারণেও অসুবিধা হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী যা বলেন আমাদের দরিদ্র দেশ, সব সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সকল প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, আমরা অনেক স্কুলে নতুন শৌচাগার করেছি। নতুন যে স্কুল বিল্ডিং হচ্ছে তার প্রত্যেক তলায় শৌচাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। আমাদের শিক্ষার জন্য যে বরাদ্দ থাকে তাতে হঠাত্ করে লোকবলসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো সম্ভব না। তবে স্কুলগুলোর শৌচাগার যথাসম্ভব পরিষ্কার ও সেখানে সাবান রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।