শিক্ষায় দারিদ্র্য জয়ের স্বপ্ন

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২০:৩৬
ভবিষ্যতে আমি শিশুদের জন্য কিছু করতে চাই যাতে তারা পড়তে, লিখতে ও নিজেদের কথা বলতে পারে। আমার ইচ্ছে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গরিব ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো- এভাবে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়েই কথা বলছিল এবারে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া হুমাইরা আক্তার। এর আগে এসএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছিল সে। দুই বোনের মধ্যে হুমাইরা বড়। দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণে ইতোমধ্যেই তার ৬ বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। এদের কারো কারো সন্তানও আছে। হুমাইরার মারও বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে, আর তার নানীর বিয়ে হয়েছিল ৯ বছর বয়সে। কিন্তু জয়পুরহাটে কাঠমিস্ত্রি পিতা ও গৃহিণী মায়ের দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠলেও হুমাইরা তার সুন্দর ভবিষ্যদের ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী। তার ভাষায়, বাবা-মা, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবের পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ প্রতিটি প্রয়োজনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। অসংখ্য মানুষের এই অনুপ্রেরণাই আমাকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। শুধু নিজের ভবিষ্যত্ বা লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত নয় হুমাইরা। প্রতিবেশী ও সমবয়সীদের মধ্যে বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে প্রতিনিয়ত সচেতনতা তৈরি করছে সে। সুযোগ পেলেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিশুদের অধিকার, সামাজিক কাজে তাদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে, ব্যস্ত থাকে কিভাবে শিশুরা তাদের গ্রামের সমাজকে আরো সুন্দর করতে পারে সাধারণ মানুষের মধ্যে সে বার্তা পৌঁছে দিতে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকেই ওয়ার্ল্ড ভিশন আর্থিক বা অনার্থিক বিভিন্নভাবে হুমাইরা ও তার পরিবারকে সহযোগিতা প্রদান করে আসছিল। এ সংস্থার শিশু ফোরামের সদস্য হয়ে সে শিশুদের সুরক্ষা, সামাজিক ও উন্নয়ন কাজে তাদের অংশগ্রহণ, বাল্য বিবাহ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা লাভ করে। সমাজকে বাল্য বিবাহের কুফল থেকে বাঁচাতে একজন শিশু অ্যাডভোকেট বা পরামর্শক হিসেবে বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হুমাইরা। তাই গত মার্চেই জাতিসংঘে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে ভাষণ দিতে ওয়ার্ল্ড ভিশন এর পক্ষে নিউইয়র্ক গিয়েছিল সে। ৫ মার্চে তার সে ভাষণে মুগ্ধ হয়ে শ্রোতারা শুনেছিল বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে কিভাবে কাজ করছে সে, সংবাদ মাধ্যম সিএনএনও ফলাও করে প্রচার করেছিল তার সাক্ষাত্কার। হুমাইরার ভাল ফলাফলে খুশি সবাই। তার ইউনিয়ন পরিষদের (তাজপুর) চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ দুলাল বলেন, খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও হুমাইরা এই এলাকায় সবচে’ ভাল ফলাফল করেছে। একই কথা জানায় তার কলেজের (জয়পুরহাট সরকারি কলেজ) শিক্ষকও-খুব গরিব অবস্থার মধ্যেও মেয়েটি এত ভাল ফলাফল করেছে। আমরা তার আরো সাফল্য কামনা করি। এবারে এইচএসসিতে জিপিএ -৫ পেয়েছে সঞ্জিতা। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার আস্কর গ্রামে এটা বিরাট সাফল্য। হতদরিদ্র জেলে পরিবারে বেড়ে ওঠা সঞ্জিতাও যেন বিস্মিত এই ফলাফলে। তার ভাষায়, খাবার ও কাপড় চোপড়ের অভাব ছোটবেলা থেকেই বোধ করছি আমরা। তারপরও চেষ্টা করেছি ভালভাবে পড়াশোনা করার। আমার স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে এখানকার দরিদ্র মানুষদের সেবা করা। মংলা উপজেলার বুড়িরডাঙ্গা গ্রামের প্রভাকর এবার এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। দিনমজুর পরিবারে বেড়ে ওঠায় পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তার পরিবারের ছিল না। কিন্তু বড় হতে হলে তাকে কষ্ট করতে হবে, লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে-এ প্রত্যয়ই তাকে ভবিষ্যতে একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হতে স্বপ্ন দেখায়। হুমাইরা, সঞ্জিতা, প্রভাকর ও অন্যদের মতো এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ১,০০০ এরও বেশি শিক্ষার্থী। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় অংশ নেয়া ১,২৩৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৫ জন এ প্লাস এবং ৫৭৮ জন এ বা এ মাইনাস পেয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের পাসের শতকরা হার (৮১%) গড় জাতীয় পাসের হারের (৭৪%) চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। এ অর্জন তাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। অত্যন্ত চমত্কার ফলাফল অর্জনের জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, পিতা-মাতা, কমিউনিটির জনগণকে নিরলস ও একাগ্র প্রচেষ্টাও বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছে। এসব শিক্ষার্থীদের মতো ওয়ার্ল্ড ভিশনও বিশ্বাস করে এই ফলাফল তাদের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন আশা ও সাফল্য বয়ে আনবে। তাদের সাহায্য করবে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড ভিশন ৩০টি জেলায় ১৮৩,০০০ দরিদ্র ও সুবিধা-বঞ্চিত শিশুদের গুণগত শিক্ষা লাভে নিয়মিত আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করছে।