বিশ্বে গত ৫০ বছরের অন্যতম পরিবর্তন

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৪
সময় কতো কিছুই না বদলে দেয়! যুক্তরাষ্ট্রে এক প্রজন্ম আগেও নারীরা মূলত ঝিয়ের কাজ করতো এবং পুরুষের যৌন লালসার শিকার হতো। আর এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই পেশাদার কর্মীদের মাঝে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পে সাফল্যের মূলে রয়েছে নারীরা। এই বিপ্লবের অন্তর্নিহিত রহস্য কী? নিঃসন্দেহে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তবে নারীবাদীদের অবদানও কম নয়। বেটি ফ্রিডম্যান যুক্তরাষ্ট্রের বিলুপ্ত করেছেন এবং বৈষম্য প্রসঙ্গে প্রায়ই গালমন্দ করতেন। মার্গারেট থ্যাচার ও হিলারি ক্লিনটনের মতো রাজনীতিবিদরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, নারীদের দ্বারা কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্কফোর্সে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ এখন সমানে সমান। তবে নারীদের এই অগ্রগতি বিশ্বের সর্বত্র সমান নয়। এমনকি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও লক্ষ্য করা যায় ব্যাপক তারতম্য। জাপান ও ইতালিতে পুরুষদের চাকরির হার মেয়েদের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। গত এক দশকে ইতালির নারীদের মাঝে চাকরির প্রবণতা বাড়লেও এখনো তা ৫০ শতাংশের নিচে এবং ডেনমার্ক ও সুইডেনের তুলনায় ২০ শতাংশেরও বেশি কম। গত ৫০ বছরে ধনী বিশ্বের লক্ষণীয় পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। পরিবর্তনের পরিসরের কারণে এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোটি কোটি নারী, যারা এক সময় পুরুষের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলো, তাদের হাতেই এখন নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে কিন্তু নারী-পুরুষের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে খুবই কম। নিঃসন্দেহে এটি সুখের বিষয়। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও আজ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে স্বাগত জানাচ্ছে। ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ধীরে ধীরে, কিন্তু এর মাধ্যমেই ঘটে যাচ্ছে বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তন। তার পরেও এখন পর্যন্ত অনেক অসুবিধা রয়েই গেছে। দ্বৈত আয়ের পরিবারগুলোর সমস্যার মূল শিকার হচ্ছে সন্তানরা। উন্নত বিশ্বে নারী ও পুরুষ উভয়েই স্বীকার করছে, অধিক কর্মব্যস্ততার কারণে কাঙ্ক্ষিত পারিবারিক জীবন তারা যাপন করতে পারছেন না। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন গত ৫০ বছরের সেরা পরিবর্তনগুলোর একটি সত্য, কিন্তু এর সামাজিক পরিণতিকে মোকাবিলা করাটা হবে আগামী ৫০ বছরের সেরা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বিশ্বের সর্বত্রই নারী শ্রমিকের চাহিদা ও সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘরের বাইরে কাজ করার ইচ্ছা নারীদের মাঝে ক্রমশই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর পেছনে অবশ্য বেশ কয়েকটি কারণও রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি নারীর প্রথাগত কাজ রান্না ও পরিষ্কার বাবদ সময় ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হচ্ছে গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট ও ইনজেকশান। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নারীকে শুধু দেরিতে বিয়ে করতেই প্রভাবিত করছে না, যোগ্যতা অর্জনের জন্য অধিক সময় প্রচেষ্টার বিনিয়োগ ঘটাতেও উত্সাহিত করছে। উচ্চ শিক্ষার বিস্তার বদলে দিচ্ছে নারীর ভবিষ্যত্। চাকরির বাজারে তাদের মূল্য বেড়ে যাওয়াতেই ঘরে বসে থাকার বদলে পেশাদার নারী হিসেবে সফল হচ্ছে। সর্বোচ্চ শিক্ষিত নারীর চাহিদা কর্মক্ষেত্রে সব সময়ই বেশি; এমনকি সন্তান জন্মদানের পরেও। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ শিক্ষিত মেয়েদের ৬২ শতাংশ ঘরের বাইরের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলো। এই হার হাই স্কুল ডিপ্লোমা অর্জনকারীদের বেলায় ছিলো ৪৬ শতাংশ। আর এখন কলেজ শিক্ষিত ৮০ শতাংশ নারীই শ্রমশক্তিতে যুক্ত। হাই স্কুল পাস করা মেয়েদের বেলায় এই হার ৬৭ শতাংশ। দুটির কোনটি ছাড়াই কাজ করছে ৪৭ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে মার্কিন মুলুকে ৪০ শতাংশ নারী বিএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলো শিক্ষায় বিশেষায়িত হয়ে। ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষায়িত হয়েছিলো মাত্র ২ শতাংশ। এখন এ হার যথাক্রমে ১২ ও ৫০ শতাংশ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার ৬০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিই অর্জন করছে নারীরা। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই চোখে পড়ছে নারীদের প্রাধান্য। পুরোপুরি মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ছাত্রী ভর্তি সীমিত রাখার চিন্তাভাবনা করছে। পারছে না কেবল সমালোচনার মুখে পড়তে হবে বলে। সেন্টার ফর ওয়ার্ক লাইফ পলিসির (সিডব্লিউএলপি) জরিপে বলা হয়েছে, বিআরআইসি’র (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন) মেধাবী নারীরা বিশ্বে একটা নতুন স্থান করে নেবে। কেননা তারা উন্নত দেশের অনেক দেশের পুরুষদের তুলনায় বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন। সব সময় তারা নিজেদের একটা ভালো অবস্থায় দেখতে চায়। সে হিসেবে ভারতের ৮৫ ভাগ ও চীনের ৯২ ভাগ কর্মজীবী নারী উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ নারী প্রশাসনের শীর্ষ পদে কাজ করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা মাত্র ৩৬ ভাগ। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীর এই আধুনিক মানসিকতা তাকে তার পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিযোগী করবে, যা তার উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটাবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর এই ক্রমবর্ধমান সাড়ার কারণে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের কাজের সুযোগ করে দিতে এগিয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ ‘ইনটেল’ নারী কর্মীদের বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিচ্ছে। কেননা তাদের ধারণা, নারীরা বেশি মনোযোগী ও কর্মনিষ্ঠ। তাছাড়া মেধার যুদ্ধে নারীরা এগিয়ে এলে তারা তাকে সাধুবাদ জানাবে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কোম্পানিতে নারী কর্মীর সংখ্যা বেশি, সেখানে সফলতার হারও বেশি। ম্যাককিনস্কি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের জরীপে বলা হয়, যেসব কোম্পানি নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে, সেসব কোম্পানির মুনাফার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। আরেকটি গ্রুপ বলছে, তারা মহিলাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরাসরি ফলের প্রত্যাশা করে। নারীরা ব্যবসার ক্ষেত্রে কেনো এতো ভালো করছে, সে সম্পর্কে রয়েছে নানা তত্ত্ব। লন্ডন বিজনেস স্কুলের মতে, উত্পাদনের মাত্রা বাড়বে যখন নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করবে। ইতিহাসবিদ হার্ভার্ড কোহেন বলেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে নারীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে একটা বড় ধরনের নাড়া দেবে। প্রমীলারা এক সময় এভাবেই বিশ্ব নেতৃত্বে এগিয়ে আসবে। নারীদের অনেক সাফল্য সত্ত্বেও সমস্যা হলো, অনেক পেশাদার নারীই মাতৃত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করছে— এ বিষয়টি যথেষ্ট ভাবনার। সুইজারল্যান্ডের পেশাদার নারীদের ১৩ শতাংশই সন্তানহীন। বাকিরা সন্তান জন্মদানকে বিলম্বিত করছে। কর্পোরেট আমেরিকাতে সন্তানহীন মহিলারা পুরুষের প্রায় সমান আয় করে। সঙ্গীসহ মায়েরা পুরুষদের তুলনায় কম আয় করে। সবচেয়ে কম আয় করে একক মায়েরা। বিস্ময়কর তথ্য হলো— পাশ্চাত্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সন্তানকে মনে করে বাড়তি এক ঝামেলা। যে কারণে তারা কোনোদিনই সন্তান না নেয়ার পক্ষপাতি। তাদের কাছে ক্যারিয়ারই মুখ্য, বাকি সবই গৌণ। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এমবিএ ডিগ্রিধারী ৫০ শতাংশ নারীই সন্তান জন্মদানের পর আর ঘরের বাইরে কাজ করতে আগ্রহী থাকে না; মনোনিবেশ করতে চায় ঘর-সংসারে। আরেকটি গবেষণা দেখিয়েছে, সন্তান জন্মদান উপলক্ষে ছুটি নিয়েছিলো এমন মহিলাদের ৭ শতাংশ কাজে ফেরার কথা আর চিন্তাই করে না। সন্তান লালন-পালনকেই মনে করে সবচেয়ে সুখের কাজ; সন্তুষ্ট থাকে স্বামীর একার রোজগার নিয়ে। ৭৪ শতাংশ নির্দিষ্ট সময়ে কাজে ফেরে, কিন্তু শতকরা ৪০ জন মাত্র ফুলটাইম চাকরিটি ধরে রাখে। বাকিরা বেছে নেয় খন্ডকালীন চাকরি। যাতে করে ঘর ও বাহির দুটিই সামলানো যায়। স্বাভাবিক কারণেই তখন কমে যায় বেতন। —ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে