টার্গেট যখন পোশাক খাত

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৫
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। সামনে আছে চীন। বাংলাদেশের এ অর্জনটি গত এপ্রিলের আগে দেশের খুব কম মানুষই জানতো। বিশ্ববাসী জানার তো সুযোগই নেই। পোশাক আমদানিকারক, যারা ‘বায়ার’ হিসেবেই অধিক পরিচিত, এরা ছাড়া বহির্বিশ্বের গণমাধ্যম বাংলাদেশের এ নীরব বিপ্লবটি গ্রাহ্যই করেনি। তাদের কাছে বাংলাদেশ মানেই দারিদ্র্য, ঝড়-বন্যা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ উত্থান, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি নেতিবাচক ঘটনার আধার। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে জানে— এরা তা বিশ্বাসই করতে চায় না। এরা মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশের অর্জনের কথা স্বীকার করলেও এর মধ্যে ‘তবে’ যুক্ত করে তৃপ্তি পায়। দেশের অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী দেশি-বিদেশি চক্র সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটো দুর্ঘটনাকে পুঁজি করেছে। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সততা, সুশাসন সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রাণখুলে প্রচার করতে পারছে। এর একটি গত নভেম্বরে ঘটে যাওয়া আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনস-এ অগ্নিকাণ্ড। অপরটি গত এপ্রিলে সাভারে রানা প্লাজা ধস। বিশ্বের কয়েকটি মিডিয়া এই দুটি দুর্ঘটনা প্রচার করতে গিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এমন সব ক্ষেত্রই আক্রমণ করেছে। অবশ্যই দুর্ঘটনাগুলোর জন্য ভবন ও গার্মেন্টস-এর মালিক, নির্মাণ ও কারখানার নিরাপত্তা তদারককারী সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী। তাদের অবহেলার কারণেই অকালে সহস্রাধিক মানুষের জীবন চলে গেছে। প্রায় অর্ধশত মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেছে। শ্রমজীবী মানুষগুলোর পরিবার আজ দুঃখের সাগরে ভাসছে। যদিও সরকার অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে এই হতভাগ্য পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত সাত দফায় প্রায় আটশ’ পরিবারকে প্রায় ১৮ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। পরিবারগুলোর কর্মক্ষম মানুষগুলোর কর্মের সংস্থান করেছে। তারপরও পরিবারগুলোর কাছে তাদের চলে যাওয়া মানুষগুলোর কোনো বিকল্প নেই। এই অসহায় পরিবারগুলো শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করার পরিবর্তে কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বেড়ে উঠা অর্থনীতিকে মন্থর করে দিতে চাইছে। নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য ম্লান করে দিতে চাইছে। লন্ডনের ‘দি ইকোনোমিস্ট’ ম্যাগাজিন ৮ আগস্টের সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশে অস্থির রাজনীতি। বিবাদরত দুই বেগম।’ সাপ্তাহিকটি গত এক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের যেনতেন প্রসার, রোহিঙ্গা সমস্য, রাশিয়ার দিকে ঝোঁকা থেকে শুরু করে রানা প্লাজা ধস এবং তৈরি পোশাক খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কমপক্ষে ৪৫টি একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অথচ তারাই ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সামরিক হামলার ঘোর সমর্থক ছিল। ম্যাগাজিনটি এর আগেও দুই নেত্রীকে বেগম বলে সম্বোধন করেছে। গত ৯ জানুয়ারির সংখ্যায় ‘বেগমরা এবং দুই বড় শক্তি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আরও কয়েকটি প্রতিবেদনে দুই দলের নারী নেত্রীকে অহেতুক হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশ যখন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা জীবিত-মৃতদের উদ্ধারে ব্যস্ত তখন পশ্চিমা কয়েকটি গণমাধ্যম বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বায়ারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা মেরে তারা দেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে পশ্চাত্মুখী করতে চেয়েছিল। একদশক ধরে তাদের আবদার, পোশাক কারখানা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে। শ্রমিকদের ভাল-মন্দ বিবেচনায় তাদের খরবদারি করতে দিতে হবে। এজন্য তারা প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ইউরোপীয় কমিশনে বাংলাদেশের শ্রমমান ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করে আসছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে অর্ধেক অঙ্গরাজ্যেই ট্রেড ইউনিয়ন করার ঢালাও অধিকার নেই। তারা এ দুটি দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে ওবামা প্রশাসনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজি করিয়েছে। ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র গত জুনে বাংলাদেশকে দেয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করেছে। অথচ পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশকে জিএসপি দেয় না। কিছু বর্ণবাদী সেবাধর্মী সংগঠনও বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় না করার এএফএল-সিআইও’র দাবিকে সমর্থন করে। অথচ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও এসব সংগঠন ভাবেনি যে পোশাক রপ্তানি বন্ধের ফলে কারখানাগুলো অচল হয়ে যাবে। এতে ৪০ লক্ষ শ্রমিক বেকার হবে। তারা আবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ফিরে যাবে। এদের ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এর ফলে দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পোশাক খাতের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র এবং বয়কট করার আহ্বান সত্ত্বেও দেশের পোশাক রপ্তানি বেড়ে চলেছে। সারণী থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়। বর্তমান সরকারের শুরুর অর্থবছর ২০০৮-০৯-এ প্রায় ১ হাজার ২৩৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। পরবর্তী চার বছরে এ রপ্তানি বেড়ে ২ হাজার ১৫২ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। চার বছরে পোশাক রপ্তানি প্রায় শতভাগ বেড়েছে। সারণী থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে দেশের মোট রপ্তানি আয় গড়ে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে রপ্তানিতে পোশাক খাতের অবদানও বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৭৯ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রথম মাস জুলাই-এ ১২৫ কোটি ডলারের নিট পোশাক এবং ১২৬ কোটি ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই মাসের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। যদিও ব্রিটেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেক্সটাইলস ইনটেলিজেন্সের সম্প্রতি প্রকাশিত টেক্সটাইল আউটলুক ইন্টারন্যাশন্যাল ২০১৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা পোশাক ক্রেতারা বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ বাতিল করে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ নতুন গন্তব্যে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তাদের এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। পোশাক মালিকরা অর্ডার কমে যাওয়ার সাথে একমত হতে পারছেন না। বাস্তবতা হচ্ছে, বায়াররা নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় করবে। এতে তাদের ব্যবসা ভাল হয়। মূলত শ্রমের মজুরি কম হওয়ায় বাংলাদেশ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাউসসহ প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে কম দামে বিক্রি করতে পারছে। এ সুযোগটি নিচ্ছে বায়াররা। তাই বিদেশি মিডিয়া, এএফএল-সিআইও, তথাকথিত মানবাধিকার গোষ্ঠীর ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা ও চাপ সত্ত্বেও বায়াররা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। বরং তারা বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে সরকার ও মালিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কারখানা পরিদর্শনের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। কারখানার নির্মাণ-ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি মোকাবেলায় মালিকদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। এজন্য তারা দাতা সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশের পক্ষে দেনদরবার করছে। পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আরেক দফা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান সরকার ২০১০ সালে নিজ উদ্যোগে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রায় দ্বিগুণ করে। পোশাক কারখানায় কিছু শর্তপূরণ সাপেক্ষে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রেখে শ্রম আইন সংশোধন করেছে। এসব ইতিবাচক অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মিডিয়া নেতিবাচকভাবে দেখতে চায়। বৈরি প্রচারণা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও দেশের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। এ নিয়ে সরকার ও কারখানা মালিক-শ্রমিকদের আত্মতৃপ্তিতে ভোগার সুযোগ নেই। প্রতিযোগী দেশ, এএফএল-সিআইও, কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া এখনও বেশ সক্রিয় আছে। সরকার এবং পোশাক মালিক-শ্রমিককে আরও তত্পর ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আন্তরিক হতে হবে। ত্রুটিগুলো প্রলেপ দিয়ে ঢেকে বায়ারদের তুষ্ট রাখতে কাকচালাকি করার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিজিএমইএ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ছাড়পত্র প্রদানের পূর্বে শর্ত পুরোপুরি পালন হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। দায়সারা ভাব পরিত্যাগ করে সকলকেই সিরিয়াস হতে হবে। ব্যবসায়িক সততা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নতুবা একসময় অশুভ শক্তিরই জয় হবে। যা গণতন্ত্রমনা, উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষী ও দেশপ্রেমিক কোনো নাগরিকেরই কাম্য হতে পারে না। সারণী: দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি চিত্র (কোটি ডলারে) অর্থবছর ২০০৮-০৯ ২০০৯-১০ ২০১০-১১ ২০১১-১২ ২০১২-১৩ নিট পোশাক ৬৪২.৯৩ ৬৪৮.৩৩ ৯৪৮.২১ ৯৪৮.৬৪ ১,০৪৭.৫৯ ওভেন পোশাক ৫৯১.৮৫ ৬০১.৩৪ ৮৪৩.২৪ ৯৬০.৩৩ ১,১০৩.৯৮ মোট পোশাক ১,২৩৪.৭৮ ১,২৪৯.৬৭ ১,৭৯১.৪৫ ১,৯০৮.৯৭ ২,১৫১.৫৭ মোট রপ্তানি ১,৫৫৬.৫২ ১,৬২০.৪৭ ২,২৯২.৪৪ ২,৪২৮.৭৭ ২,৭০২.৭৪