সাম্প্রতিক কালের একটা আলোচ্য বিষয় হলো বাংলাদেশে ক্রিকেটে নৈতিকতার ধস নামা। অবশ্য এ সমস্যা বিশ্বব্যাপী বলা যায়। প্রায় কোনো দেশই এর আওতামুক্ত নয়। বিশেষত বিশ্ব-ক্রিকেটের শক্তিধর দেশগুলোতে এর দৃষ্টান্ত দেখা যায়। তবে দেশের সর্বত্র যেখানে নৈতিকতার সঙ্গে আপস করতে দেখা যায়, সেখানে ক্রিকেট ভিন্ন কিছু নয়। তবে যেহেতু এটা চিত্তবিনোদনের মাধ্যম এবং যা নিয়ে মানুষ গর্ব করতে পারে, তাই জনসাধারণ ক্রিকেটকে কলুষমুক্ত দেখতে চায়। এতে কোনোরূপ আপস করা জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল এবং এতে খেলার আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে আশরাফুলের কথা বলা যায়। তার মতো মাপের খেলোয়াড়ের এই ফাঁদে পা দেওয়া সমীচীন হয়নি। যারা গড়পরতা খেলোয়াড় তাদের হয়তো এই লোভ সংবরণ করা কঠিন। কারণ তাদের নৈতিক থেকে হয়তো এইরূপ অর্থ উপার্জন কষ্টকর। অপরপক্ষে, আশরাফুলদের মতো খেলোয়াড়দের নৈতিকতা বজায় রেখেও বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক খেলা ও বিজ্ঞাপন থেকে ভালো অর্থ লাভের সম্ভাবনা থাকে। তবে তা সব একসঙ্গে ঘটে না— ক্রমান্বয়ে ঘটে। আর এখানেই আশরাফুল স্বর্ণ প্রসবিনী হাঁসের সমস্ত ডিম একসঙ্গে হস্তগত করতে গিয়ে হাঁস বধের মতো অবস্থায় পড়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাবেক কোচ জেমি মিডন্সের মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য নয়। তিনি বলেছিলেন, আশরাফুলের ওপর পারিবারিক বোঝা তাকে এ কাজে প্ররোচিত করেছে। কারণ বিশ্বের অনেক তারকা খেলোয়াড় যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ে, ভারতের আজাহারউদ্দিন, পাকিস্তানের সেলিম মালিক প্রমুখকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত হতে দেখা যায়। যাদের ওপর কোনো বোঝা নয় বরং নগদ প্রাপ্তিই তাদের এপথে প্ররোচিত করেছে—“এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি”।
এর প্রতিবিধানে শাস্তির প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যাবে না যাতে কেউ তা পুনরাবৃত্তি করতে সাহসী না হয়। তবে এতে তাদের খেলা দেখার যে আনন্দ তা থেকে দর্শকদের বঞ্চিত করা হয়। যেমন ম্যারাডোনা মাদকের কবলে পড়লে মাঝেমধ্যেই তাঁর খেলার বিঘ্ন ঘটেছে এবং তাতে দর্শকদের তাঁর জাদু দেখা থেকে বঞ্চিত করেছেন। এক্ষেত্রে বলা যায়, যেহেতু বাংলাদেশে এটা নতুন ফেনোমেনা এবং এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নাই। তাই প্রথমবার হিসাবে বিশেষত খেলোয়াড়দের কিছুটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যায়। কারণ এ বিষয়ে কঠোর আইন থাকলে তারা হয়তো এপথে পা বাড়াতো না। এখন প্রায় প্রত্যেক দেশই এর প্রতিবিধানে ফৌজদারি আইন করতে চাচ্ছে।
বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বিশেষত মেধাবীরা যাতে অপরাধের দিকে ঝুঁকে না পড়ে তার সর্বাত্মক চেষ্টা নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে আর্থিক প্রণোদনা বাড়াতে হবে এবং প্রাপ্তি সহজ করতে হবে। সাকিব, তামিম ও মুশফিকরা যে এ পথে পা বাড়ায় নাই তা বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট স্বস্তিকর ব্যাপার। কারণ প্রথম সারির খেলোয়াড়দের কোনো কারণে পাওয়া না গেলে যে দলের অবস্থা কী হয় তা আমরা জিম্বাবুয়ের অবস্থা থেকে দেখতে পাই।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সর্বক্ষেত্রেই নৈতিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই শুধু সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম
