গভীর রাতে বাসায় ফেরার পথে মহল্লার গলির মাথায় শুনতে পেলাম দুই দোকানদারের গল্প—সিগারেট নিয়া নাকি নতুন আইন করছে, ১০০ ট্যাকা জরিমানা দিতে হইবো ইত্যাদি। এরই মাঝে অন্য একজন মন্তব্য করলেন, ‘সিগারেট খাওয়া নিয়া যত আইন করুক না ক্যান মাইনষে সিগারেট খাইবোই!’ কেন খাবে সিগারেট? কী ‘মধু’ আছে সিগারেটে? ধূমপায়ী মাত্রই জানেন ‘ধূমপানে বিষপান’। সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকছে ‘ধূমপান ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ’, ‘ধূমপানে স্ট্রোক হয়’, ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ ইত্যাদি। তবুও তৃতীয় বিশ্বে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে ধূমপায়ীদের সংখ্যা। রূপকথায় রয়েছে দেবতাদের আর্শীবাদে জন্ম হয়েছে তামাক গাছের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই গাছটির কোনো ভেষজগুণ আজো আবিষ্কৃত হয়নি। গবেষণায় পাওয়া গেছে এর ক্ষতিকারক দিকগুলো।
যদিও মানুষ ধূমপান করে আসছে বহু বছর আগে থেকেই কিন্তু এর স্বাস্থ্য ঝুঁকি ঘনিষ্ঠভাবে দেখা হলো ১৯৫০ সাল থেকে। চিকিত্সকদের গবেষণা বলে, সিগারেটে থাকে চার হাজারেরও বেশি ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ। এতে আছে আর্সেনিক। আরো আছে এমন রাসায়নিক পদার্থ যা পাওয়া যায় গ্যাসোলিনে। আরো আছে ব্যারিলিয়াম নামের বিষাক্ত ধাতব কণা। আছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, যা ব্যবহার করা হয় ব্যাটারিতে। সিগারেটে রয়েছে নিকেলের অস্তিত্ব। কাঠে বার্ণিশ করতে যেসব উপাদানের প্রয়োজন হয় এমন একটি উপাদান থাকে সিগারেটে। জেনে হয়তো অবাক হবেন, সিগারেটে এমন রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে যা ব্যবহার করা হয় ইঁদুর মারার বিষ তৈরিতে। তাই ধূমপানে একজন মানুষের উপকারি দিক তো নেই অথচ রয়েছে অন্তহীন ক্ষতিকারক দিক। পা থেকে মাথা পর্যন্ত এমন কোনো অংশ নেই যেখানে ধূমপানের ক্ষতি নেই। ধূমপান মহাধমনী থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম রক্তনালী পর্যন্ত সব জায়গায় তার বিষাক্ত থাবা বসায়।
ধূমপায়ীদের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান ১৬তম। বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষ। লক্ষ করলে দেখা যাবে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন সিগারেটসেবী। তাহলে সারাদেশে সিগারেটসেবীর সংখ্যা ৫ কোটি প্লাস। কেউ খাচ্ছেন ৬ টাকা দামের সিগারেট আবার কেউ ২৫ পয়সা দামের বিড়ি। আমরা ধরে নিচ্ছি গড়ে সবাই এক টাকা দামের সিগারেটই খাচ্ছেন (যদিও এখন এক টাকা দামের সিগারেট নেই) প্রতিদিন কেউ খাচ্ছেন ৭/৮ টা আবার কেউ ২০টার ২ প্যাকেটই সাবাড় করে দিচ্ছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি গড়ে প্রতিদিন ১০ টা করেই হজম করছেন। তাহলে ফলাফল দাঁড়ালো এই যে, বাংলাদেশে ৫ কোটি লোক প্রতিদিন ৫ কোটি গুণ ১০ সমান ৫০ কোটি টাকা পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছেন। এভাবে দিনে ৫০ কোটি হলে মাসে ১৫শ’ কোটি। বছরে ১৮ হাজার কোটি। সরল মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে বাংলাদেশের বছরে বাজেট জানি কত?
ধূমপান ছাড়ার পাঁচটি টিপস—
বিশেষ একটি দিন ঠিক করুন: দিনটির আগের দিন সব সিগারেট, অ্যাশট্রে এবং লাইটার ফেলে দিন, আপনার বাড়িতে কাউকেই ধূমপান করতে দেবেন না। একটি কাগজে লিখে রাখুন কেন আপনি ধূমপান ছাড়তে চান।
আপনার পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীর সহযোগিতা নিন: গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যের সহযোগিতা পেলে ধূমপান ছাড়া সহজ। আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ধূমপান ছাড়ার তারিখটি জানান এবং তাদের সহযোগিতা করতে বলুন।
ধূমপানের বিকল্প খুঁজুন এবং প্রতিদিনের রুটিন বদলান: যখন ধূমপান করার ইচ্ছে হবে, এমন কিছু করুন, যাতে আপনার মন অন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকে। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন, হাঁটতে বের হয়ে যান অথবা সিনেমা দেখতে হলে চলে যান। প্রচুর পানি ও জুস খান। এর সঙ্গে আপনি আপনার প্রতিদিনের রুটিন বদলাতে পারেন। কফির পরিবর্তে চা পান করুন। সকালের নাশতা একই জায়গায় প্রতিদিন খাবেন না। কর্মস্থলে যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করুন।
ধূমপান ছাড়ার ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন: চিকিত্সকের পরামর্শ নিন। কিছু ধূমপায়ীর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যদি সে ধূমপান ছেড়ে দেয় যেমন: বিষণ্নতা, ঘুম না-আসা, বিরক্তবোধ বা অস্বস্তিবোধ করা এবং পরিষ্কার চিন্তা করতে না পারা। কিছু ওষুধ উল্লিখিত উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। অধিকাংশ ওষুধ সিগারেটের মূল আসক্তিকর উপাদান নিকোটিনের মাত্রা রক্তে ধারাবাহিকভাবে কম পরিমাণ অবমুক্তকরণের মাধ্যমে কাজ করে। চিকিত্সকের পরামর্শ নিন কোন্ ওষুধটি আপনার জন্য সঠিক।
পুন ধূমপানের প্রবণতা থেকে সতর্ক থাকুন: অধিকাংশ ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়ার প্রথম তিন মাসের মধ্যেই আবার ধূমপান শুরু করে, এতে আশাহত হবেন না। মনে রাখবেন, অনেকের ক্ষেত্রেই এটি ঘটে কিন্তু সফল হয় নিজের মঙ্গলের জন্য। আপনি চিন্তা করুন, কোন্ বিষয়গুলো ধূমপান ছাড়ার জন্য সহায়ক ছিল এবং কোনগুলো ছিল না। এগুলো বের করতে পারলে আপনার সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে মনে রাখবেন সেই আপ্তবাণী— ‘ধূমপান ছাড়তে আপনার নিজের ইচ্ছাটাই যথেষ্ট।’
ধূমপায়ী শুধু নিজেরই ক্ষতি করছে না, ক্ষতি করে চলছে আশেপাশের অধূমপায়ীদেরও। খুবই সতর্ক থাকতে হবে পাশের বা ঘরের শিশু ও সন্তান-সম্ভবা নারীর প্রতি। কোমল প্রাণের এই মানুষগুলো যেন কোনোভাবেই ধূমপানের শিকার না হোন। তামাক সেবনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে এখনই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে সমাজকে এই অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। তবে এই অবক্ষয় রোধে শুধু সিগারেটের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়, সকল ধরনের তামাক এবং তামাকজাত পণ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেই কেবল সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
ঢাকা
