সিরিয়ায় হামলা চালানোর ব্যাপারে মিত্র দেশগুলো যদি পিছুও হটে তবুও একা অগ্রসর হতে পারে ওবামা প্রশাসন! মিত্র দেশগুলো কিংবা জাতিসংঘ কোনো পক্ষই যদি সমর্থন না দেয় তারপরেও হামলা চালানোর ব্যাপারে আগ্রহী ওয়াশিংটন। তবে আন্তর্জাতিক জোট গঠন প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ব্রিটেন এই প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয়ার জন্য পার্লামেন্টে বৃহস্পতিবার ভোটাভুটির আয়োজন করেছিল, কিন্তু সেখানে অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়। তারপরেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সিরিয়ায় হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। অপরদিকে, ফ্রান্স হামলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু জার্মানি ও কানাডা আন্তর্জাতিক মিত্রজোটে থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। খবর এপি, সিএনএন ও বিবিসির।
সূত্র জানায়, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যারি হার্ফ বলেছেন জাতিসংঘ যদি সমর্থন নাও দেয় তবু সিরিয়ার রাসায়নিক হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র । তিনি বলেন, জাতিসংঘের মতামতের বিরুদ্ধে রাশিয়ার বারংবার অনমনীয় অবস্থানের কারণে আমরা এক জায়গায় আটকে থাকতে পারি না। অপরদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, সিরিয়া যে তার দেশের নিরীহ জনগণের উপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে সে ব্যাপারে কারো সন্দেহ নেই। তাই দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক এবং বর্তমান কর্মকর্তারাও মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র একাই সিরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। তারপরেও জোট গঠনের চেষ্টা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন। গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল বলেন, ‘যৌথ সামরিক হামলা চালানোর লক্ষে আমরা আন্তর্জাতিক জোট গঠন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
এদিকে, সিরিয়ায় হামলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে পারে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়াঁ ওলাঁদ বলেছেন, বুধবার নাগাদ সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালানো হতে পারে। তবে কোন প্রেক্ষাপটে তিনি এই সময়সীমা উল্লেখ করেছেন তা জানাননি। হামলার ব্যাপারে ব্রিটেন আকস্মিকভাবে সরে আসায় তার সরকারের ভূমিকার ওপর কোন প্রভাব পড়বে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। গতকাল শুক্রবার লা মদেঁ পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স দামেস্ক সরকারের বিরুদ্ধে কঠিন ও সুসংগত ব্যবস্থা চায়।’
অন্যদিকে, ইসরাইল শুক্রবার তেল আবিবে তাদের আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। প্রতিবেশী দেশ সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালানোর কথা বিবেচনায় নেয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটি এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করলো। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম একথা জানায়। ইসরাইলের সেনা বেতার কেন্দ্রের খবরে বলা হয়, ভ্রাম্যমাণ এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাটারি সকালে বৃহত্তর তেল আবিব এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন সিরিয়া উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশের নিরাপত্তার জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইসরাইল তাদের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। তিনি বলেন, ইসরাইল সিরিয়া যুদ্ধে জড়াতে চায়না। তবে সিরিয়া যুদ্ধের ঘটনায় কেউ ইসরাইলের নাগরিকদের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে ইসরাইলের সেনাবাহিনী শক্তি দিয়ে এর জবাব দেবে। অপরদিকে, সিরিয়ায় হামলা আসন্ন মনে করে দেশটি থেকে বিশেষ করে রাজধানী দামেস্ক থেকে লোকজন নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরোধীতা
সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের প্রস্তাব ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অফ কমন্সের ভোটাভুটিতে নাকচ হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে যুক্তরাজ্যের যোগ দেয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডেভিড ক্যামেরনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়া কঠিন হয়ে এলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৭৮২ সালের পর ক্যামেরনই হলেন প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যার সামরিক অভিযানের প্রস্তাব পার্লামেন্টের অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হলো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এই সিদ্ধান্তের কারণে ওয়াশিংটন-লন্ডন সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র একাই সিরিয়ায় অভিযান চালাতে পারে বলে ইতোমধ্যে ইংগিত দিয়েছে বারাক ওবামা প্রশাসন। দামেস্কের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে কয়েকশ’ মানুষকে হত্যার অভিযোগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারকে দায়ী করে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চায় পশ্চিমা দেশগুলো। এ বিষয়ে ব্রিটেনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাবও দেয়া হয় গত বুধবার। অবশ্য সিরিয়ার মিত্র রাশিয়া ও চীন বলে আসছে, সিরিয়া সরকারই গ্যাস হামলার জন্য দায়ী কি না, তা প্রমাণ হওয়ার আগেই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।
এই অভিযানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে আসা ক্যামেরন বুধবার একবার পার্লামেন্টে প্রস্তাব তুললেও লেবার পার্টিও বিরোধিতার মুখে পড়েন। ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন সদস্যও ইরাক যুদ্ধে তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভূমিকাও এ নিয়ে ব্রিটেনের সমালোচনায় পড়ার কথা মনে করিয়ে দেন। তারপরও ক্যামেরন প্রস্তাবটি এগিয়ে নিতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাতে ভোটাভুটি হয়। এতে সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের বিপক্ষে ২৮৫ ভোট পড়ে, আর ক্যামেরনের প্রস্তাবকে সমর্থন দেন ২৭২ জন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এই বিশেষ অধিবেশনের ডাক দিয়েছিলেন।
ভোটাভুটিতে পরাজয়ের পর ক্যামেরন বলেন, ‘সিরিয়ায় যা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া জরুরি ছিল বলে আমি মনে করি। তবে এটা স্পষ্ট যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চায় না। সরকার পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানাবে।’ যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড পরে সাংবাদিকদের বলেন, সিরিয়া অভিযানে ব্রিটেনের যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা ভালভাবে নেবে বলে তিনি মনে করেন না।
