মত প্রকাশে ব্লগিংই তারুণ্যের ভরসা

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বাকী বিল্লাহ। লেখালেখির অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই। স্থানীয় পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় পত্রিকায়ও। কিন্তু নিজের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে এমন প্রায় অধিকাংশ লেখাই কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। এ নিয়ে হতাশ হয়ে ২০০৭ সালে পরিচিত হন বাংলায় ব্লগিংয়ের সাথে। নিজের যেকোনো ধরনের মতামতই তাত্ক্ষণিকভাবে অনলাইনে প্রকাশ এবং ঐ মতামত সম্পর্কে অন্যদের মন্তব্য পেয়ে উত্সাহিত হন তিনি। মতপ্রকাশের স্বাধীন মাধ্যম হিসেবে ছাত্রজীবনে সেই যে ব্লগিংকে বেছে নিয়েছেন কর্মজীবনেও তা অব্যাহত রেখেছেন। বাকী বিল্লাহর মতই নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশে এখনকার তরুণরা বেছে নিয়েছেন বাংলা ভাষায় ব্লগিংকে। ইন্টারনেটভিত্তিক এ মাধ্যমে ব্লগিং একদিকে যেমন সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করছে, অন্যদিকে জনমত তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেকটা মানসিক প্রশান্তির জন্য ব্লগাররা লেখালেখি করলেও ধীরে ধীরে এর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন ব্লগিংয়ে জড়িতরা। ব্লগিংয়ের বিভিন্ন সাইট ঘেটে এবং কয়েকজন ব্লগারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ভাষায় ব্লগিং শুরু হয় ২০০৬ সালের শুরুর দিকেই। দেশে ব্যক্তিগত ব্লগিং সাইট কতগুলো তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসেব নেই। তবে ১০ থেকে ১৫টি সামাজিক ব্লগিং সাইট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ সাইটগুলোতে ব্লগাররা রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, অর্থনীতি, অপরাধ, বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, আইন, বিভিন্ন তত্ত্ব বিষয়ে লেখালেখি করে থাকেন। ব্যক্তিগত নানা অনুভূতিও প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ব্লগিংয়ে বেশি জড়িত থাকলেও কলেজ পড়ুয়াদেরও এখন এ মাধ্যমে উপস্থিতি রয়েছে। অনেকে ব্লগিংয়ের মাধ্যমে আয়ও করছেন। ব্লগিং কেন করছেন- বেশ কয়েক ব্লগারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, ভালো লাগা বা মানসিক প্রশান্তি এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি এবং জ্ঞান অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করার জন্যই তারা ব্লগিং করেন। ব্লগাররা বলছেন, আগ্রহ থেকেই কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তারা লেখা শুরু করেন। এজন্য ঐ বিষয়ে যদি ভালো জ্ঞান না থাকে তবে কমবেশী পড়তেও হয়। নতুন কিছু জানা ও শেখার জন্য এবং অন্যদের তা জানিয়ে দেয়ার জন্যই ব্লগিং। আবার বাংলাভাষায় জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিতেই অনেকে ব্লগিং করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাভাষায় শিক্ষাবিষয়ক ব্লগিং ওয়েবসাইটও তৈরি হচ্ছে। এটি এখনও ততটা জনপ্রিয়তা না পেলেও রাগীব হাসানের লেখা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জনপ্রিয় কয়েকটি সামাজিক ব্লগিং সাইট সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে যে সাইটগুলো বেশ জনপ্রিয় তার মধ্যে রয়েছে-www.sachalayatan.com, somewhereinblog.net, amarblog.com, techtunes.com.bd, nishorga.com, drishtipat.org/bangla। এছাড়া গণমাধ্যমের ব্লগিংসাইটও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেইসবুক এবং মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটারের মত সাইটগুলোকেও অনেকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনমাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছেন। শুধু সামাজিক ব্লগিং সাইটগুলোই নয়, তারকা ব্লগারদের ব্যক্তিগত ব্লগও খুবই জনপ্রিয়। জনমত তৈরিতে ব্লগিং দেশে বাংলা ভাষায় ব্লগিংয়ের যাত্রা খুব বেশি দিনের না হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে। জনমত তৈরিতে ব্লগ সাইট ও ব্লগারদের ভূমিকা দৃশ্যমান হচ্ছে। আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের মত আন্দোলন যেমনি বিশ্বব্যাপী সারা জাগিয়েছে। তেমনি বাংলাদেশেও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ বেশ সারা জাগিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে কয়েকজন ব্লগারের আহবানে শুরু হওয়া এ আন্দোলন আলোড়ন তুলে দেশজুুড়ে। এছাড়া ব্লগাররা নিজেদের মত প্রচারেও তৈরি করছেন বিভিন্ন প্লাটফর্ম। জাতীয়স্বার্থে ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক এরকমই দুইটি সুপরিচিত প্লাটফর্ম। এ প্রসঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্ত এবং ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের মারুফ রসুল বলেন, একটি বিষয়ে নিজের মত বিস্তারিত তুলে ধরতে ব্লগিংয়ের তুলনা হয় না। এছাড়া জনমত তৈরিতে এখন ব্লগিং দারুণ একটি মাধ্যম। তাই তরুণরা এটি বেছে নিয়েছে। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মোক্ষম জবাবও দেয়া যায় এ মাধ্যমে। এদিকে ব্লগিংয়ে জনমত তৈরির সুযোগ থাকলেও মিথ্যা প্রচারেরও সুযোগ রয়েছে। মিথ্যা তথ্য ও ছবি সম্পাদনা করে দেয়া বিভিন্ন পোস্ট বিভ্রান্তিও তৈরি করে। এজন্য অনেক ব্লগারদের দায়িত্বহীনতাই দায়ী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ইন্টারনেটভিত্তিক এ মাধ্যমে একটি অসাধু চক্রও অর্থের বিনিময়ে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর লেখা প্রচার করছেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক বলেন, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এখন ব্লগিং একটি শক্তিশালী মাধ্যম বলে প্রমাণিত হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণরা সোচ্চার হয়ে উঠছে। তাই ব্লগিং এবং জনমত তৈরিতে ব্লগাররা যে শক্তি অর্জন করেছে তা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্লগের নেতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। এজন্য কিছু ব্লগারের দায়িত্বহীনতা ও বিশেষ উদ্দেশ্যে গড়ে উঠা একটি ব্লগারগোষ্ঠী দায়ী। তারা ভুল তথ্য ও ছবি সম্পাদনা করে মিথ্যা প্রচার চালায়। ব্লগিং কী? ব্লগকে ওয়েবসাইটভিত্তিক ব্যক্তিগত ডায়রি বলা হয়। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ব্লগিং হলো এক ধরনের অনলাইন ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ব্যক্তিকেন্দি ক পত্রিকা। যিনি ব্লগে পোস্ট করেন তাকে ব্লগার বলা হয়। ঐ পোস্টে অন্য ব্যবহারকারীরা মন্তব্য করতে পারেন। সময়ের বিবর্তনে ব্লগিংয়ের ধারাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন ব্যক্তিগত ডায়রির পরিবর্তে ব্লগ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।