আগামী সংসদ নির্বাচনকে বাংলা-দেশের জন্য সংকটকাল বলে মন্তব্য করেছেন কানাডীয় হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন। ঠিক একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখি অবস্থানের প্রেক্ষাপটে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়টিকে সিইসি ‘কঠিন’ বলে মন্তব্য করেন। কানাডীয় হাইকমিশনার ও সিইসি গতকাল শনিবার দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে এই অভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গতকাল বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইন্সটিটিউট (বিএফটিআই), গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ শীর্ষক এক সেমিনারে কানাডীয় হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন বলেন, নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে, যেটি ব্যালটের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। কে জনগণের নেতৃত্ব দেবেন—তা নির্বাচন করতে পারা তাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা আশা করব সবাই যাতে তাদের মত প্রকাশ করতে পারে।
এদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কানাডার উদ্বেগের কথা জানান হিদার ক্রুডেন। তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্জন হুমকির মুখে পড়তে পারে। এসব কারণে অনেক বিদেশি কোম্পানির মধ্যে প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে যে তারা ঝুঁকি কমানোর জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে কি না। এটি বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক হানাহানি প্রত্যাখ্যান করে তিনি সরকার ও বিরোধী দলকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
কানাডার জিপিটি (জেনারেল প্রিফারেন্সিয়াল ট্যারিফ) সংশোধনের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কোন সমস্যা সৃষ্টি হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমপ্রতি শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পায় এমন ৭২টি দেশের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাদেরকে এই সুবিধা থেকে বাদ দিয়েছে কানাডা। এই তালিকায় বাংলাদেশ না থাকায় যথারীতি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। কিন্তু তালিকায় ভারত ও চীন রয়েছে যাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস এর মূল কাঁচামাল আমদানি করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এই শুল্কের আওতায় পড়ে যাওয়ার আশংকা তৈরি হয়। তবে কানাডা এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নেবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রী জি এম কাদের বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তিনি বলেন, জনগণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান, গত ছয় মাস রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল। কিন্তু আমি বিনিয়োগ সুরক্ষার বিষয়ে গ্যারান্টি দিতে পারি। যে কোন সরকারের সময়ই এটি নিরাপদ। বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য উত্কৃষ্ট স্থান। রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও গত জুলাইয়ে রেকর্ড পরিমাণ রপ্তানি আয় হয়েছে।
গতকাল আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনে আয়োজিত বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন সার্ভিসেস অফিসার্স এসোসিয়েশনের প্রথম সাধারণ সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেক বড় একটি কাজ। এটা আমাদের জন্য একটা পরীক্ষা। সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে আপনাদের (কর্মকর্তাদের) নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’
সিইসি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, সামনে দশম সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন না থাকলে আপনাদের অস্বিত্ব নেই। নির্বাচনেই আপনারা সরাসরি ভূমিকা রাখেন। এর চেয়ে বড় দায়িত্ব আর হতে পারে না। কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, সামনে অত্যন্ত কঠিন সময়। নিজেদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় বাদ দিয়ে অত্যন্ত নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ক্রিটিসিজমের কোনো সুযোগ দেয়া যাবে না।
ওই সভায় ইসি কর্মকর্তারা তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনা করেন। সিইসি তাদের নিজেদের আগে জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করতে বলেন। এ বিষয়ে সিইসি জানান, আগে জাতীয় স্বার্থ, তারপর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ। তৃতীয়ধাপেই নিজেরদের কথা ভাবতে হবে। নির্বাচনের মহাযজ্ঞে অনেককে দিয়ে কাজ করাতে হয় ইসিকে। অন্যদের দিয়ে কাজ করানোয় প্রতিকূলতাও রয়েছে। ইসির কর্মকর্তাদের বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা ও আইন বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে কাজটা উঠিয়ে নেয়া কঠিন। প্রশিক্ষণ ও আইনগত বিষয়ে নিজেদের আরো উপযোগী করার পরামর্শ দেন সিইসি।
সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ আদায়ে কারো পক্ষে কাজ করা যাবে না। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সবাইকে জাতীয় স্বার্থে নিবেদিত হয়ে কাজ করতে হবে। এজন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে সবাইকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করে নিজেদের প্রমাণ করার আহ্বান জানান তিনি।
সার্ভিসেস এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ইসি সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো ঃ জাবেদ আলী, ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিকসহ ইসি সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের তিন শতাধিক কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো এসোসিয়েশনের ওই সাধারণ সভায় অংশ নেন।
