সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২৩:২১
যুক্তরাষ্ট্র সরকার অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে যাচাই করে দেখেছে যে, গত ২১ আগস্ট দামেস্ক-এর শহরতলিতে রাসায়নিক অস্ত্র হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াও আরো যেসব মাধ্যম থেকে তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো হলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সিরীয় চিকিত্সা কর্মীবৃন্দ, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, দামেস্ক ও এর আশপাশের কমপক্ষে ১২টি এলাকার হাজার হাজার সোশ্যাল মিডিয়া রিপোর্ট, সংবাদকর্মীদের ভাষ্য এবং অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য বেসরকারি সংগঠনসমূহের প্রতিবেদন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি প্রাথমিক যাচাই প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় ১৪২৯ জন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ৪২৬টি শিশু। সিরীয় শাসকগোষ্ঠী মাস্টার্ড, সারিন ও ভিএক্সসহ ব্যাপক সংখ্যক রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ বজায় রাখে। এছাড়াও তাদের আছে হাজার যুদ্ধ সরঞ্জাম যা দ্বারা রাসায়নিক অস্ত্র হামলা করা সম্ভব। রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের। নিরাপত্তা ও আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করে এই কর্মসূচির সদস্যদেরকে বেছে নেয়া হয়। সিরীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সিরিয়ান সায়েন্টিফিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ (এসএসআরসি) সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করে থাকে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আমরা যাচাই করে দেখেছি যে সিরীয় শাসকগোষ্ঠী বিগত বছরে বেশ কয়েকবার দামেস্ক শহরতলিসহ বিরোধীদের ওপর স্বল্প মাত্রায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এই যাচাই প্রতিবেদন তৈরি করবার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিরিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের রাসায়নিক অস্ত্র হামলার পরিকল্পনা ও সেগুলো বাস্তবায়ন। বেশ কিছু আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে গবেষণাগারে বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য থেকে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আর এ থেকে জানা গেছে যে তারা সারিন দ্বারা আক্রান্ত। রাসায়নিক হামলায় যে ধরনের অস্ত্র প্রয়োগ করা হয় বলে আমরা ধারণা করছি সিরীয় শাসকগোষ্ঠীর সে সব ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে । যে ধরনের হামলা সংঘটিত হয়েছে আমাদের কাছে এমন কোনো ইঙ্গিত বা প্রমাণ নেই যে সিরিয়ার বিরোধীদের পক্ষে এ ধরনের একটি বড় আকারের সমন্বিত রকেট ও আর্টিলারি হামলা চালানো সম্ভব। বিরোধীরা যাতে দামেস্ক-এর শহরতলিকে সরকারের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য ওই এলাকাকে বিরোধী শক্তিমুক্ত করবার জন্য সিরীয় শাসকগোষ্ঠী একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা অনুমান করি যে দামেস্ক-এর বড় অংশ দখল করতে না পারার হতাশাই হয়তো সিরীয় শাসকগোষ্ঠীকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যা থেকে আমরা জানতে পারি যে, এসএসআরসি কর্মসূচির কর্মীরাসহ সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির কর্মীরা ওই হামলার আগে রাসায়নিক গোলাবারুদ প্রস্তুত করছিল। রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির কর্মীরা আদ্রায় গত ১৮ আগস্ট থেকে ২১ আগস্ট ভোর পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২১ আগস্ট সিরীয় শাসকগোষ্ঠী দামেস্কর কিছু এলাকায় গ্যাসমাস্ক ব্যবহারসহ রাসায়নিক অস্ত্র হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। আমাদের গোয়েন্দা উত্স এমন কোনো ইঙ্গিত পায়নি যে, ওই হামলার আগে বিরোধীরা রাসায়নিক অস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করেছিল। একাধিক গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য নির্দেশ করে যে, শাসকগোষ্ঠী দামেস্কর শহরতলিতে ওইদিন রাতে রকেট ও আর্টিলারি হামলা চালায়। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য হতে এটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে যে, হামলাটি শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে চালানো হয় এবং কাফর বাতনা, জবার, আইন তারমা, দারায়া এবং মু-আদদামিয়াহসহ এমন লোকালয়ে আঘাত হানে যেখানে রাসায়নিক হামলা সংঘটিত হয় বলে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। একাধিক বিবরণ অনুযায়ী বিরোধীগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্য ভর্তি রকেট আঘাত হানে। অত্যন্ত বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক মানবসহায়তা সংস্থা অনুযায়ী ২১ আগস্টের সকালে তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দামেস্কর বিভিন্ন এলাকার তিনটি হাসপাতাল প্রায় ৩৬০০ রোগী ভর্তি করার কথা জানায়, যারা স্নায়ু প্রভাবক রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শের ফলে যেমন লক্ষণ প্রদর্শন করার কথা, তেমন লক্ষণ প্রদর্শন করে। হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একশটি ভিডিও আমরা চিহ্নিত করেছি, যার অধিকাংশই বিপুল সংখ্যক মানবদেহ প্রদর্শন করে যেগুলোতে স্নায়ু প্রভাবক রাসায়নিক দ্রব্যের সংক্রমণের চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। এই চিহ্নগুলো স্নায়ু প্রভাবক রাসায়নিক দ্রব্যের সংক্রমণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও কেবল এমন সংক্রমণের ক্ষেত্রেই নয় অন্য ক্ষেত্রেও এসব চিহ্ন দেখা যেতে পারে। ঘটনার শিকারদের মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তার মধ্যে সংজ্ঞাহীনতা, নাক ও মুখ হতে ফেনা উদগীরণ, চোখের মণি স্থির থাকা, দ্রুত হূদস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে জটিলতা অন্তর্ভুক্ত। অনেকগুলো ভিডিওতে অসংখ্য মরদেহ দেখা যায়, যাদের শরীরে কোনো প্রকাশ্য আঘাতের চিহ্ন নেই যা রাসায়নিক অস্ত্রের হামলার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, উচ্চ বিস্ফোরক গোলাবারুদ বা ব্লিস্টার অস্ত্রের হামলার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সকলের জন্য উন্মুক্ত এমন ভিডিওগুলোতে কমপক্ষে ১২টি স্থান প্রদর্শিত হয় এবং সেই ভিডিওগুলোর একটি নমুনার পর্যালোচনায় নিশ্চিত করা গিয়েছে যে, এগুলোর কিছু কিছু ভিডিওর বিবরণ মোতাবেক সাধারণ সময় ও স্থানে রেকর্ড করা হয়েছে। আমাদের পর্যালোচনা মতে, এ সকল ভিডিও, এনজিও ও চিকিত্সাকর্মী কর্তৃক পুনঃনিশ্চিত করা শারীরিক লক্ষণসমূহ এবং এই রাসায়নিক আক্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য জালিয়াতি করার মতো সামর্থ্য সিরীয় বিরোধীগোষ্ঠীর নেই। বিপুল পরিমাণ তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে যা থেকে আমরা এ উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে, শাসকগোষ্ঠীর কর্মকর্তাগণ হামলা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন এবং এই হামলা পরিচালনার নির্দেশ দেন। এই হামলা সম্বন্ধে গভীরভাবে অবগত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একটি কথোপকথন সম্বন্ধে আমরা অবগত হই যিনি এটা নিশ্চিত করেন যে, ২১ আগস্ট রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহূত হয় এবং জাতিসংঘ ইন্সপেক্টরগণ এ সম্বন্ধে তথ্য পেয়ে যাবেন বলে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সূত্রঃ মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইট