এমন অভিনব প্রতিবাদ আর হয় না। ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল গ্রীনপিস কর্মীরা ঘিরে ফেলেছিলো লন্ডনস্থ ইউনিলিভারের হেডকোয়ার্টার্স। নিরাপত্তাকর্মীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওরাং ওটাংয়ের সাজে বিল্ডিং বেয়ে কেউ কেউ উপরে উঠছিলো লাফিয়ে লাফিয়ে। মূল ফটকের বাইরে দাঁড়ানো কর্মীদের হাতে ছিলো প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা—ইউনিলিভার আমাদের বনাঞ্চল ধ্বংস করো না। মূল অভিযোগটি ছিলো ডাভ সাবানের দিকে। কারণ এতে ব্যবহূত প্রধান উপকরণটি পামওয়েল। ঠিক একই দিনে ইউনিলিভারের রোম ও রটেরডাম অফিসের সামনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলো গ্রীনপিস কর্মীরা। আর এই আন্দোলনের তোড়ে ইউনিলিভার পরবর্তী সময়ে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়, ২০১৫ সাল নাগাদ তাদের প্রয়োজনীয় সমস্ত পামওয়েলই সংগৃহীত হবে সমর্থনযোগ্য উত্স থেকে।
ইন্দোনেশিয়ার ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় পবিবেশবাদীরা প্রতিবাদের এ ভিন্ন কৌশল বেছে নেয়। পামওয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। এই তেলের কারণে অনেক এশীয় বন্যপ্রাণীই শুধু বিলুপ্ত হচ্ছে না ; গ্রহের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি বিপজ্জনক। অথচ পামওয়েল চাষ বাড়ছে যেনো জ্যামিতিক গতিতে। ১৯৬৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় এর চাষ হয়েছিলো মাত্র ২ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলে, আর এখন তা ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। পামওয়েল চাষ এবং অবৈধভাবে গাছ কাটা ইন্দোনেশিয়াতে এতোই দ্রুতগতিতে বাড়ছে যে, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) সম্প্রতি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০২২ সালের পরে দেশটিতে বন বলে আর কিছুই থাকবে না।
একের পর এক বন ধ্বংস হতে থাকায় অবমুক্ত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড।পৃথিবীর সর্বোচ্চ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমক দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া একটি। সেই সঙ্গে দেশটিতে সামাজিক সংঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে এই পামওয়েল। এর চাষাবাদের বিস্তারের কারণে বিশেষ করে আদিবাসীরা হচ্ছে বাস্তুচ্যুত। ওরাংওটাং ছাড়াও সুমাত্রা ও বোর্নিও’র হাতি, বাঘ ও গন্ডাররা আজ হুমকির মুখোমুখি। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পামওয়েলের অবদান বিশাল। সব কিছু মিলিয়ে পামওয়েলের বৃহত্ ক্রেতারা পড়েছে বিব্রতকর অবস্থায়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে ইউনিলিভার। সর্ববৃহত্ ক্রেতা হিসাবে বিশ্বে উত্পাদিত মোট পামওয়েলের শতকরা ৪ ভাগই কিনে নেয় তারা।
পামওয়েল গল্পের শুরুটা ১৮৪৮ সালে। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশজ পণ্য দূরপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় নেয়নি। পামগাছের আকর্ষণীয় লাল ফল তেলসমৃদ্ধ। প্রথম প্রথম এর ব্যবহার শুধু সাবানেই সীমাবদ্ধ ছিলো; কিন্তু পরবর্তীতে স্টিম ইঞ্জিনের লুব্রিক্যান্ট হিসেবেও বেছে নেয়া হয় এটিকে। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ১৯৩০-এর দশকে পামওয়েল চাষের বিস্তার ঘটে মালয়েশিয়াতে। শিল্প পরিপক্ব হওয়ার পর প্রতিবেশী মালয়েশিয়াও তোড়জোড় শুরু করে। বিশ্বে উত্পাদিত মোট পামওয়েলের শতকরা ৯০ ভাগেরই জোগান দেয় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। অনেক খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে এর ব্যবহার এখন অবাধ। পিনাট বাটার ,মারজারিন, আইসক্রিম, লিপস্টিক ও শেভিং ফোমে এটি যেনো অপরিহার্য উপকরণ। এই তেল যুক্ত করলে সাবান ও শ্যাম্পু হয় অধিক ক্রীম।
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পামওয়েলের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও এখন পর্যন্ত ভেজিটেবল ওয়েলের চেয়ে অনেক কম। তেল বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান ওয়েল ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধি মিডফ্রিড ফ্রাংক জানান, ২০১২ সালে বিশ্বে মোট পামওয়েল উত্পাদিত হয় ৪৮.৯ মিলিয়ন টন; অথচ আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ৪৭.৮ মিলিয়ন টন। বাড়তি উত্পাদনের সিংহভাগই আসছে ইন্দোনেশিয়া থেকে। বর্তমানে পামওয়েল একটি কার্যকরি শস্য। সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের চেয়ে উত্পন্ন হয় দশগুণ বেশি। কাজেই দাম কম হলেও ক্ষতি নেই। যে কারণে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে পামওয়েল চাষের হিড়িক পড়েছে।
আলোচনা-সমালোচনা,আন্দোলন ও উদ্বেগের কারণে কিছুটা সচেতনতা অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে । সমর্থনযোগ্য পামওয়েল উত্পাদনের জন্য সৃষ্টি হয়েছে ‘রাউন্ডটেবল অন সাসটেইনেবল পামওয়েল (আরএসপিও) নামক সংগঠন। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উত্পাদক, প্রক্রিয়াজাতকারক, খাদ্য কোম্পানি, এনজিও ও বিনিয়োগকারীরা। সমর্থনযোগ্য পামওয়েল বলতে তারা যা বোঝাতে চাইছেন তা হলো- বনাঞ্চল ধ্বংস না করে তেল উত্পাদন করা। এমন তেলের ব্যাপারে সনদ প্রদানের ক্ষমতা রাখে তারা। তাই এ ধরনের পামওয়েলের প্রতি অনেকেই উত্সাহ দেখাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এমন তেল কিনতে গেলে স্বাভাবিকের চেয়ে দাম বেশি পড়ে। ফলে ২০০৯ সালে উত্পাদিত সমর্থনযোগ্য পামওয়েলের ৩০ শতাংশই অবিক্রীত থেকে গিয়েছিলো ।
আরএসপিও-কে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। পামওয়েলের কারণে ঠিক কী পরিমাণ গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, তাই তারা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারেননি, এবং এ ব্যাপারে তারা কাউকে চাপও দিতে পারছে না। নিন্দুকরা আরএসপিও’র নাম দিয়েছে ‘রিয়েলি স্লো প্রোগ্রেস ওভারঅল’। পরিবেশবাদীরা এই সংগঠনের কর্মকাণ্ডে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। কট্টর পরিবেশবাদীদের দাবি, বনাঞ্চল ধ্বংস না করে উত্পাদন করতে পারলে করো , নইলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করো।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ইউনিলিভার অঙ্গীকার করেছে, ২০১৫ সালের পর তারা বনাঞ্চল ধ্বংস করা কোনো পামওয়েল আর কিনবে না। কিন্তু তেমন প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে না অনেক নামি-দামি কোম্পানি। ডব্লিউ ডব্লিউ এফ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৯টি ইউরোপীয় কোম্পানির পামওয়েল ক্রয়নীতি স্বচ্ছ নয়।
