স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। নির্দিষ্ট বিষয়ে চার-ছয় বছরের পড়াশোনা। সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে এসে আধুনিক তরুণদের বড় একটি অংশ চিন্তা করছে তারা চাকরি করবেন না। চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করবেন। নিজের কর্মসংস্থান তো অবশ্যই, অন্যের কর্মসংস্থানেরও চিন্তা করছেন তারা। উদ্যোক্তা হওয়ার সাহসী প্রত্যয় গ্রহণ করছেন উচ্চশিক্ষিত উদ্যমী তরুণরা। দেশে সফল তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা এখনও খুব বেশি নয়। তার-পরও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনশেষে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে বিদেশের বিভিন্ন ঘটনা এবং দেশের কয়েকজন সফল তরুণ উদ্যোক্তাই তাদের স্বপ্ন দেখতে ও এগিয়ে যেতে সাহস জোগাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ব-বিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চুয়েট, কুয়েট, এআইইউবি, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউল্যাবসহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনার্স শেষ বর্ষ ও মাস্টার্স পর্বের শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকজন সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ও সংকল্পের কথা। অনুষদ ও বিভাগ ভেদে তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যে ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য একটাই। উদ্যোক্তা হওয়া। এ জন্য নিজেদের প্রস্তুতও করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. সাইমুম হোসেন বলেন, দেশের চাকরির বাজার এখন তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সবাই যদি চাকরি খোঁজে, চাকরি দেবে কে? এ চিন্তা থেকে আর নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার ইচ্ছা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এতে করে যেমন নিজের উদ্ভাবনী শক্তির সঠিক প্রয়োগ সম্ভব, অন্যদিকে দেশের-সমাজের প্রতি বেশি অবদান রাখা সহজ হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র আবীর আব্দুল্লাহ বলেন, আমাদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার কাজটি কঠিন। একদিকে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অন্যদিকে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু নিজের ও দেশের সার্বিক উন্নতির দিকে মনোযোগ দিতে চাইলে উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে ভালো কাজ আর নেই।
কেন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের (জরিপ-২০১২), কমনওয়েলথ যুব কর্মসূচিসহ (২০১১) কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার জরিপের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ তরুণ। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫। প্রায় পাঁচ কোটি তরুণের মধ্যে ১২ ভাগ সম্পূর্ণ বেকার এবং ২৩ভাগ আংশিকভাবে বেকার। চাকরির পরীক্ষাগুলোতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং আশানুরূপ সুযোগ না হওয়ায় অনেক তরুণেরই ইতিমধ্যে আশাভঙ্গ হয়েছে। দেশের সার্বিক এ চাকরি পরিস্থিতি সচেতন ও উদ্যমী করে তুলছে তরুণদের। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে সদ্য পাস করে একটি মোবাইল কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন সোহেল (ডাকনাম)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। বেশ কিছু ব্যবসায় পরিকল্পনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বও দেখিয়েছেন। কিন্তু পারিবারিক কারণে চাকরিতে যোগ দিতে হয়েছে তাকে। এখন স্বপ্ন দেখছেন চাকরি থেকে কিছুটা অভিজ্ঞতা এবং অর্থ উপার্জন করে নিজের মত করে এন্টারপ্রাইজ শুরু করার। আগামী বছর থেকেই তিনি এ যাত্রা শুরু করবেন বলে জানালেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পর্বের আট বন্ধু তিন বছর আগে ‘ফাইটার এগেইন্স্ট পভার্টি নামে নিজেদের একটি গ্রুপ তৈরি করেছিলেন। আগামী বছর পড়াশোনার আনুষ্ঠানিক পাঠ চুকে গেলে তারা রাজশাহীর দরিদ্র মহিলাদের নিয়ে পোশাক তৈরির জন্য সাংগঠনিক ও ব্যবসায়িক পদ্ধতিতেই কাজ শুরু করবেন বলে জানালেন।
যে ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আসছেন তরুণরা
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পড়াশোনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তরুণরা অনেকটা নিজেদের মতো করেই ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে মাঠে আসছেন। কেউ যেমন সনাতনী ধারণা নিয়ে আসছেন, কেউ কেউ আনকোরা নতুন ধারণা নিয়ে আসছেন।এক্ষেত্রে সফটওয়্যার তৈরি-উন্নতকরণ, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার সংযোজনের প্রবণতা যথেষ্ট। তবে দেশীয় বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাহিদাসম্পন্ন পণ্যে রূপান্তরিত করে বাজারজাত করতে আগ্রহ বেশি সৃজনশীল তরুণদের। এছাড়া খাদ্য, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষিজ পণ্য উত্পাদন ও সেবা তৈরিতে আগ্রহী তরুণরা।
যেমন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র ছাত্র সাজিদ হোসেন বোতলজাত পানি ও বৈদ্যুতিক বাল্বের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে তার চিন্তা-গবেষণা বেশ এগিয়ে নিয়েছেন। সমপ্রতি একটি ব্যবসায় পরিকল্পনা প্রতিযোগিতায় এ নিয়ে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন।
এছাড়া দেশে বিভিন্ন সময় আয়োজিত ব্যবসায় পরিকল্পনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও অনেক শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের শিক্ষার্থী ফাতেমা ইসলাম স্বপ্ন দেখছেন তামাকমুক্ত স্বাস্থ্যকর সিগারেট-স্টিক তৈরি ও বাজারজাতকরণের। চুয়েটের পারভেজ আলম স্বপ্ন দেখছেন বাংলাভাষার সকল শব্দ-অভিব্যক্তি ডিজিটাল ডিকশনারিতে স্থান করে দিতে।
