ধোবাউড়ায় ১৪৪ ধারা অব্যাহত বিজিবি মোতায়েন, আটক ৬

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১২
১৪৪ ধারা ভেঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরকান উদ্দিন মৃধা ওরফে সেলিম নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গত রবিবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ৬ জনকে আটক করেছে ধোবাউড়া থানা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন গামারীতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক খান পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ভাংচুর করেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। তিন দফা নামাজে জানাজা শেষে গতকাল সোমবার বিকালে উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের খিলাগড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে চেয়ারম্যান সেলিমের লাশ দাফন করা হয়। এদিকে উপজেলা সদরে এখনও ১৪৪ ধারা অব্যাহত রয়েছে। র্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি গতকাল সকাল সোয়া ৯টায় সেখানে বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল রাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হত্যার ঘটনায় মামলা হয়নি। অন্যদিকে ওয়াকিবহাল মহল অভিযোগ তুলেছে যে, ১৪৪ ধারা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। ১৪৪ ধারা বাস্তবায়ন করা গেলে রবিবারের সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা এড়ানো যেতো। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপারের দেয়া বক্তব্য ভিন্নতর। তিনি বলেছেন, ১৪৪ ধারা জারির প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে হয়নি। ধোবাউড়া থানা পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, রবিবার রাতে আটক ছয়জন হলেন গামারিতলার মিলন (১৮), মুরাদ (২০), ইদ্রিস (৩৭), আব্দুল জলিল (২৮), সাতারিয়া পাড়ার ইমরান (২৪) ও ছোট মুন্সীপাড়ার আল আমিন (১৯)। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফুরকান উদ্দিন মৃধা নিহত হওয়ায় ধোবাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ৩ দিনের শোক পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তিন দফা জানাজা ও লাশ দাফন সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়না তদন্ত শেষে গতকাল দুপুর ১২টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরিবারের সদস্যদের কাছে চেয়ারম্যান সেলিমের লাশ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় হাসপাতালে আসা চেয়ারম্যানের বৃদ্ধা মা সমেলা খাতুন ও স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া শিল্পী ও ২ মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পরে ময়মনসিংহ শহরের বড় মসজিদে গতকাল বাদ যোহর চেয়ারম্যান সেলিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এমপি, পৌর মেয়র ইকরামুল হক টিটুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বিকাল ৩টা ৪০মিনিটে চেয়ারম্যানের মরদেহ ধোবাউড়া উপজেলা সদরে নেয়া হয়। ধোবাউড়া হাইস্কুল খেলার মাঠে ৪টা ৫ মিনিটে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রমোদ মানকিন, জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী, পুলিশ সুপার মঈনুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হারুন অর-রশিদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ উপজেলা প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অংশ নেয়। পরে দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের খিলাগড়া গ্রামে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে চেয়ারম্যান সেলিমের লাশ দাফন করা হয়। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। রবিবারের সংঘর্ষ প্রসঙ্গে প্রমোদ মানকিন বলেছেন, এটা কোন দলীয় কোন্দল নয়, নিছক ব্যক্তিগত আক্রোশের বহি:প্রকাশ। ১৪৪ ধারা নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য রবিবারের ১৪৪ ধারা জারির ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর হুছাইন ইত্তেফাককে বলেন, ‘১৪৪ ধারা কার্যকর করার জন্য গুলিসহ যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি। জনগণকে সতর্ক করার জন্য মাইকিংসহ সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছি। বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব হলো পুলিশের।’ পুলিশ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে ওসির সাথে কথা বলতে বলেন। এ ব্যাপারে ওসি আব্দুল হকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লাইন কেটে দেন। তবে পুলিশ সুপার মঈনুল হক বলেন, ‘১৪৪ ধারা জারির প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি। কাগজে বাস্তবায়ন হলেও বাস্তবে ১৪৪ ধারা কার্যকরের জন্য পুলিশকে সময় বা প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ১৪৪ ধারা জারির আদেশটি আমি ফ্যাক্সে পেয়েছি ওইদিন বিকাল ৪টা ৪৭ মিনিটে।’ জেলা প্রশাসক মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ১৪৪ ধারা জারি করে আমাকে অবহিত করেছেন। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ও পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় ১৪৪ বাস্তবায়নে সমস্যা হয়েছে।’ সংঘর্ষে গুরুতর আহত চেয়ারম্যানের ভাই মজনুকে গতকাল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, রবিবার ধোবাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে খাবার রুমে প্রবেশ ও খাবার গ্রহণকে কেন্দ্র করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফুরকান উদ্দিন সেলিম গ্রুপের সাথে গামারীতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুুল হক খানের গ্রুপের মধ্যে প্রথমে কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যানের ভাই মজনুর নেতৃত্বে আজিজুল হক খানের উপর হামলা করা হয়। এ নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিলে প্রশাসন উপজেলা সদরে ওইদিন বিকাল চারটা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করে। এরই মধ্যে আজিজুল হক তার এলাকা কলসিন্দুর বাজারে গিয়ে সমর্থকদের জড়ো করেন। বিকাল ৫টার দিকে প্রতিশোধ নিতে আজিজুল লোকজন নিয়ে উপজেলা সদরের দিকে রওনা দেন। ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে আজিজুল হক খান গ্রুপ ও উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রুপ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে কমপক্ষে ১২ জন আহত হয়। এর মধ্যে চেয়ারম্যান সেলিম, তার ভাই মজনু ও টিপু এবং আওয়াল ও রিপন নামে আরও দুইজনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রবিবার রাত সোয়া ৮টায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় চেয়ারম্যান মারা যান।