সোমালিয়ার রূপকথা

হায়েনা ও শেয়ালের গপ্পো

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ১৯:৩৬

শহরের এক প্রান্তে বেশ কয়েকটি গ্রাম। সেই গ্রামে শেয়ালের বড় উত্পাত। রোজই গেরস্তবাড়িতে হানা দেয় শেয়াল। নিশুতি রাতে মুরগি-ভেড়া চুরি করে নিয়ে যায়। কোনোভাবেই এই চুরিচামারি বন্ধ করা যাচ্ছে না। গাঁয়ের লোকজন পড়েছে মহাবিপদে। এমন উত্পাত আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়? বিহিত একটা কিছু করতেই হয়।

গ্রামবাসীরা সবাই মিলে শলাপরামর্শ করল। ধূর্ত শেয়ালটাকে পাকড়াও করতেই হবে। যে কোনো মূল্যে। ওটার অত্যাচারে উপদ্রবে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে অনেককেই। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। বৈঠকে ঠিক করা হলো, ভালো আর মজবুত একটা ফাঁদ পাততে হবে। সেই ফাঁদে আটকা পড়বে শেয়াল। তখন বাছাধন বুঝবে কত ধানে কত চাল।

তা-ই করা হলো। ফাঁদের ওপর দিয়েই দৌড়াচ্ছিল শেয়াল। আচমকা আটকা পড়ল। ভেড়ার বাচ্চা চুরি করে মনটা ছিল ফুরফুরে। ঝটপট পালাতে গিয়ে হঠাত্ই বারোটা বেজে গেল তার। ধরা খেয়ে সে কী হাঁকডাক চিত্কার। হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া। শেয়াল যতই ছুটতে চেষ্টা করে, ফাঁদের শক্ত দড়ির বাঁধন তত জোরালো ও ধারালো হয়। চেপে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। জোরেশোরে নড়াচড়া করতে গিয়ে পেটে পিঠে ছড়ে গেছে। প্রচণ্ড ব্যথা করছে। এখন কী উপায়? শেয়াল মহাচিন্তিত। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে তার। বেঘোরে প্রাণটা বুঝি এবার যাবেই যাবে। সারা রাত কান্নাকাটি, চেঁচামেচি করে করে পার হলো। কেউ তাকে বাঁচাতে এল না।

পরের দিন গাঁয়ের লোকজন এসে দেখে, ওমা এ কী কাণ্ড! পাজি শেয়ালটা তো ঠিকই আটকেছে। ফাঁদের ভেতর ছটফট করছে। সবাই মহাখুশি। যাক বাবা। দুর্দিন বোধহয় ফুরাল অবশেষে। মুরগি-ভেড়াগুলো এখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। বদমাশ ধাড়ি শেয়ালটার পেটে যেতে হবে না আর। ফাঁদে বন্দি শেয়াল দেখে লোকজন আনন্দে হৈ হল্লা করে উঠল। হিপ হিপ হুর রে। শয়তান শেয়াল এবার বুঝবে মজা!

সবাই মিলে ঠিক করল, শেয়ালকে পুড়িয়ে মারা হবে। সেজন্যে একটা গর্ত খোঁড়া দরকার। সেই গর্তে ফেলে কাঠকুটো চাপা দিয়ে আগুন দিতে হবে। চোট্টামির উপযুক্ত শাস্তি সে এভাবেই পাবে। বেশ কয়েকজন লেগে গেল ফাঁদ থেকে অল্প দূরে, গর্ত খোঁড়ার কাজে। আরো বেশ কয়েকজন তড়িঘড়ি করে ছুটল বনে। সেখান থেকে কাঠকুটো, লাকড়ি জোগাড় করে আনবে তারা। বন বেশ দূরে। ফিরে আসতে সময় লাগবে তাই।

শেয়াল একা ফাঁদে ছটফট করছে। তাকে কেউ পাহারা দিচ্ছে না। সবাই যার যার কাজে মহাব্যস্ত। এমন সময় কোত্থেকে এক হায়েনা এসে হাজির। সে ভীষণ ক্ষুধার্ত। দানাপানির খোঁজে হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ঘোরঘুরি করছিল সে। খিদের চোটে প্রাণ ঝালাপালা। ঘুরতে ঘুরতে সে ফাঁদের কাছে এসে পৌঁছায়। দেখে, ভেতরে একটা শেয়াল। দড়ি দিয়ে বাঁধা। হায়েনা জানতে চায়, শেয়াল ভায়া, তোমার এই হাল কেন? ওখানে কী করছ তুমি? তোমাকে এমন করে বেঁধে রেখেছে কে? কেন এই অবস্থা তোমার?

ধূর্ত শেয়াল দেখে, এই তো মওকা। এই হাঁদাটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে যদি মুক্তি পাওয়া যায় তো বেশ হয়। ওকে পটাতে হবে মিষ্টি কথায়, ছলনায়। এমন করে কাজটা করতে হবে, বুদ্ধুটা যেন কিচ্ছুটি টের না পায়। মনে মনে শেয়াল কৌশল চিন্তা করে নেয়। মিষ্টি হেসে হায়েনাকে বলে সে, আর বোলো না রে ভাই। এটা আমার চাচার কাণ্ড। উনিই আমাকে বেঁধে রেখে গেছেন। আমি একটু দুষ্টু স্বভাবের তো, সে কারণে। তিনি আমার জন্যে একটা কচি ভেড়া শিকার করে আনবেন। একটু দূরে লোকজন যেখানে গর্ত খুঁড়ছে, সেখানে পোড়ানো হবে কচি ভেড়া। উহ্, দারুণ হবে খেতে। ইচ্ছে করলে তুমি দেখে আসতে পারো গর্ত খোঁড়ার কাজটা কতদূর এগোল। তবে খুবই সাবধানে যাবে। লুকিয়ে লুকিয়ে। কেউ টের পেয়ে গেলে কিন্তু তোমার জান নিয়ে টানাটানি হবে। তোমাকে সতর্ক করে দেওয়া আমার কর্তব্য। পরে যেন আমাকে দোষ দিতে না পার। সেজন্যেই একথা তোমাকে বলছি রে ভাই।

কচি ভেড়ার কথা শুনে হায়েনার মুখে লালা এসে যায়। আহা। কতদিন খাওয়া হয়নি। সে করে কী, চুপিচুপি দেখে আসে গর্ত খোঁড়ার কাজ। হ্যাঁ, তা-ই তো। শেয়াল একবর্ণ মিথ্যে বলেনি। ফিরে আসে ফাঁদের কাছে। শেয়াল দেখে, বোকাটা ভালোমতোই পটে গেছে। এখন ওকে দিয়ে বাকি কাজ সেরে নিতে হবে। কী কাজ? মুক্ত হওয়ার কাজ।

হায়েনার জিভ চুলবুল করছে। কচি ভেড়ার মাংস টানছে তাকে। শেয়ালকে সে বলে, আমাকেও একটু ভাগ দিয়ো ভাই। খিদের জ্বালায় আর পারছি না। কচি ভেড়ার মাংস খেতে হলে কী করতে হবে? একটু বলে দাও না।

শেয়াল একটু ভাব নেয়। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে, আমার তো পেট ভরা। অনেক খাওয়াদাওয়া হয়েছে কিনা। আমি আর কতটুকু খাব? তুমি হচ্ছ আমার অতিথি। বন্ধু, আপনজন। তোমার শুকনো মুখ দেখে ভীষণ মায়া লাগছে আমার। তা বন্ধু, এক কাজ করো ঝটপট। আমাকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্ত করে দাও। তারপর তোমাকে হালকা করে বেঁধে রাখব এখানে। চাচাজি ভেড়া নিয়ে ফিরে এলেই কোনো চিন্তা নেই আর। আমরা দুই ভাই তখন মজা করে মাংস খাব। নাও, শুরু করো।

ভেড়ার লোভে হায়েনার মাথা বেশ গরম। তর সইছে না তার। ক্ষিপ্র গতিতে দ্রুত সে শেয়ালকে মুক্ত করে দেয়। চতুর শেয়াল এতক্ষণ এই মুহূর্তটির জন্যেই অপেক্ষা করছিল। হাবা হায়েনাটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে তারপর। বাঁধাছাঁদা সে করে বেশ ভালোমতোই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই কাজটা সারা হয়ে যায়। শেয়াল এক দৌড়ে চম্পট দেয়।

কিছুক্ষণ পরে গাঁয়ের লোকজন কাঠকুটো, লাকড়ি নিয়ে ফিরে আসে। এসে তারা হতবাক। আশ্চর্য ব্যাপার তো। কোন ফাঁকে শেয়াল ভেগে গেছে। সেখানে একটা হায়েনা বাঁধা। লোকজন বুঝতে পারে, ধূর্ত শেয়াল এই হায়েনাটিকে ফাঁদে ফেলে নিজে পালিয়েছে। তারা মহাবিরক্ত। কী আর করা! শেয়ালের পরিবর্তে হায়েনাকেই তারা গর্তে ফেলে পোড়ানো শুরু করে দেয়। লোভ আর বোকামির মূল্য এভাবেই দিতে হলো হায়েনাকে।