ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৩৮
সময়ের আবর্তে ঋতু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে নানা রকম ঝড় সংঘটিত হয়। তার আবার বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এর কোনটির উত্পত্তিস্থল সমুদ্র। আবার কোনটির স্থলভাগ। আমাদের দেশের স্থল ভাগের ঝড়, যেমন-কালবৈশাখী, টর্নেডো, ইত্যাদি। আর আপনারা সবাই অবহিত আছেন যে, কালবৈশাখীর উত্পত্তিস্থল উড়িষ্যা-বিহারের এলাকা থেকে। অবশ্য ঝড় বলতে যা বোঝায় তার অধিকাংশের উত্স হলো সমুদ্র ও মহাসমুদ্র। মূলত ঘূর্ণিঝড় হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়। এটি বায়ু মণ্ডলীর একটি অবস্থা, যা বাতাসের প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মান গতির ফলে সংঘটিত হয়। প্রতিবছর এ পৃথিবী জুড়ে গড়ে ৮০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এই ঘূর্ণিঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮ কিঃ মিটারের উপরে। উল্লেখ্য যে, সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা তার বেশি হয়, তখন ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টির অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। সাধারণত ৫ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ হতে ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের উদ্ভব ঘটে। এখানে উল্লেখ্য যে, একটি ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীর আবর্তন থেকে সৃষ্ট কোরিওলিস ফোর্স থেকে ঘূর্ণায়মান গতিপ্রাপ্ত হয়। কার্যত বিষুব রেখায় এই শক্তি শূন্য (০) পর্যায়ে থাকে বিধায় ঠিক বিষুব রেখা থেকে ঘূর্ণিঝড় কখনো সৃষ্টি হয় না। যাহোক, এদের স্থানীয় নাম সম্পর্কে উল্লেখ্য যে, আটলান্টিক মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে ‘হারিকেন’ বলে। ভারত মহাসাগর এবং প্রশন্ত মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে যথাক্রমে ‘সাইক্লোন’ ও ‘টাইফুন’ হিসেবে অভিহিত। আর এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড়ের নানা রকম আকর্ষণীয় নাম আছে। অবশ্য এই নামকরণের পিছনে আছে চমকপ্রদ ঘটনা। সাধারণত অবস্থান এবং ঋতুর বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে কতগুলো এলাকায় মাঝে মধ্যে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। আর তার মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম। সেহেতু প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছিল, সেটা ছিল প্রায় তিনশ’ বছর আগে শ্রীলংকার মহাপরাক্রমশালী রাজা মহাসেনের নামে। আর এ ব্যাপারে নাম প্রবর্তনকারী জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়াবিদ সংস্থা ‘এস্কেপ’। বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড়ের নাম নারীদেরকে ঘিরে, যেমন- নার্গিস, বিজলী, রেশমী, ক্যাটরিনা, রিটা ইত্যাদি। আর সেহেতু ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের পরে বঙ্গোপসাগরে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছিল ‘ফাইলিন’। এরপরে ঝড়ের নাম হিসেবে পুরুষের নাম সংযোজিত হতে থাকে। বর্তমানে অবশ্য বস্তু বা অন্য বিষয়ের নাম অবস্থাভেদে টেনে আনা হয়েছে, যেমন-সিডর, মেঘ, বায়ু, সাগর ইত্যাদি। আর যেহেতু ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস ও মৃত্যুর হাতছানি থাকে। সেহেতু একবার একটি নামে নামকরণ করা হলে, দ্বিতীয়বার তা ব্যবহূত হয় না। অবশ্য অতীতেও ঘূর্ণিঝড়কে ঘিরে নামকরণ করা হতো। সেটা ছিল ঝড়ের উত্পন্ন অবস্থানকে নিয়ে। তা আবার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ ভিত্তিক। এ প্রেক্ষাপটে যদি বলি ৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশের ঝড়টি এখন চট্টগ্রাম থেকে এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছে, তাহলে সব সময়ে মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি বলি ‘সিডর’ চট্টগ্রাম থেকে এক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছে, তাহলে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সবাই অনায়াসে বুঝতে পারবেন। এই নামকরণের কাজ করেন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি। তাই উত্তর ভারতীয় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে নামকরণের দায়িত্ব পড়েছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের। সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের আগেই নামকরণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ইতোমধ্যে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে—এর মধ্যে মহাসেন আঘাত হেনেছে, তত্পর আসবে ফাইলিন। এরপর নির্বাচিত নাম- হেলেন, লহর, মাদী, নানাউক, হুদহুদ, নিলুফার, প্রিয়া, কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়নতদ, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা, কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা ও আমপান। স্মরণকাল থেকেই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনে চলেছে, যা কমবেশি জানা যায় পুঁথি ও পুরাতন গ্রন্থে। অনেক ধর্মগ্রন্থে এর আলামত উল্লেখ আছে। যাহোক, ইদানিং অর্থাত্ ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে ঝড়টি আঘাত হানে, তার নাম ছিল সিডর অর্থাত্ চোখ। আর এই নামটি দিয়েছিল শ্রীলংকা। এদিকে ২০০৮ সালে নার্গিস নামে যে ঘূর্ণিঝড়টি মিয়ানমার উপকূলে আঘাত হানে, সে নামটি দিয়েছে ভারত। এই নামের ব্যাপারে যতদূর জানা যায়, এটি নাকি নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত প্রয়াত ভারতীয় নায়িকা নার্গিসকে উপলক্ষ করে। এদিকে তিন বছর আগে অর্থাত্ ২০০৯ সালে ভয়ঙ্কর যে ঘূর্ণিঝড়টি প্রলয়তাণ্ডব ঘটায়, সেটা হলো আইলা (এর অর্থ হলো ডলফিন বা শুশুক)। আর আইলা নামকরণের কাজটি করেছেন, মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা। এস্কেপ কর্তৃক নামকরণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কেননা সময় ও অবস্থান ধরে ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে রাখা সুকঠিন। কারণ যদি নামকরণ না করা হয়, তাহলে এক প্রজন্মের পরেই বিস্মৃতির কোঠায় চলে যাবে। যদিও বলেন, বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগে সময় ও অবস্থান ধরে সংরক্ষণ করলে, তা পরবর্তীতে প্রয়োজনে খুঁজে পাওয়া যাবে। তথাপিও নানা জটিলতা হেতু সঙ্গতকারণেই তা মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্ণিত আকর্ষণীয় নামে নামকরণ থাকলে মনে রাখার সুবিধা হয়। আর এই নামের আদলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সেই প্রলয়ঙ্ককরী ধ্বংসযজ্ঞের কথা তুলে ধরে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেয়ার পথ সুগম হবে।