একটি মেয়ে। একটি ছেলে। খেলছিল।
খেলছিল মানে এক্কা দোক্কা খেলছিল।
মেয়েটির বয়স আট। ছেলেটির নয়। বয়সটা আনুমানিক। আনুমানিক এ কারণে যে, ওদের জন্ম কোনো হাসপাতাল কিংবা কোনো বাড়িতে হয়নি। আর তাই কোনো জন্ম সনদই নেই তাদের। খেলতে খেলেতে ঘুমিয়ে পড়ে ওরা। মাটির ওপর। মাটির ওপর মানে তালতলা প্রাইমারি স্কুলের বারান্দার মেঝের ওপর। মাথার নিচে নেই বালিশ। শরীরের নিচে নেই কোনো মাদুরও।
একটি মেয়ে। একটি ছেলে।
মেয়েটির নাম রুপালি ছেলেটির নাম বাদল।
রুপালি যেদিন পৃথিবীতে এসেছিল সেদিন আকাশে উঠেছিল। রুপোর মতো চাঁদ। চারদিক ছিল সাদা ফকফকা। আগারগাঁওয়ের বস্তিঘরে জন্ম হয়েছিল তার। ঝুপড়ির ছেঁড়া পলিথিনের ফাঁক দিয়ে রুপোর মতো গলে পড়েছিল চাঁদের আলো। আর তাই মা সুখজান বিবি তার নাম রেখেছিল রুপালি। তার জন্মের সময়ও বাবা তার মায়ের কাছে ছিল না। মা বলে আটাশির বানে ভেসে গেছে সে।
একটি ছেলে।
ছেলেটির নাম বাদল। গায়ের রং তামাটে। চুলগুলো শজারুর মতো খাড়া। কপালের একপাশে কাটা দাগ। দাগেও যে একটি শিল্প থাকে সেটি তার প্রমাণ। ঠিক বাঁকা চাঁদের মতো কালো দাগ।
বাড়ি কোথায়?
হোমনায়।
গিয়েছিস কখনো?
না।
বাবা কী করে?
বিয়ে করায়।
বাদলদিনে ওর জন্ম, তাই ওর নাম বাদল।
বাবা নামের লোকটি বেজায় খিটখিটে। সকালে বের হয়। সন্ধ্যায় বস্তিতে ফিরে মাকে কারণে অকারণে মারে। মারে আর মুখে খিস্তি করে। বাবা বাদলের কাছ থেকে হিসাব নেয়—
কয়টাকা পাইছস?
কুড়ি টাকা।
মাত্র কুড়ি?
হ।
হাচা কইছস?
হাচা।
মিথ্যে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। হাত পেতে যা পায় তা থেকে কিছু কিছু করে জমায় বাদল। মাকে দেয়।
মা জানতে চায়, এত টেহা দিয়ে তুই কী করবি?
জমামু। ছোট এট্টা খাবারের দোকান দিমু। চা-র দোকান। টেহা দিয়ে তোমার শাড়ি কিনুম।
মা হাসে। স্বপ্ন দেখে, বাদল স্কুলে যাচ্ছে। কাঁধে স্কুলব্যাগ। চুলগুলো শজারুর মতো খাড়া। মুখে মিষ্টি হাসি। ছেলের ডান হাত ধরে আছে মা।
বাদল বড় হয়েছে। এখন সে বড় স্কুলে যায়। ক্রিকেটের ব্যাট আর বল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়। সে এখন ক্রিকেটার। তার স্বপ্ন মুস্তাফিজের মতো বড় ক্রিকেটার হবে সে।
তার জীবন এখন অনেক সুন্দর। বাবা এখন ভালো হয়েছে। অনেক ভালো। মাকে এখন আর মারে না।
একটি ছেলে। একটি মেয়ে।
বাদল আর রুপালি। দুজনই বড় স্কুলে যায়। দুজনে মিলে চিত্কার করে গান গায়। আমরা করব জয়। আমরা করব জয়। আমরা করব জয় একদিন।
এক্কা দোক্কা ছেড়ে ওরা ছুটছে। ছুটছে সামনে। সামনে এবং আরো সামনে। অন্ধকার পেছনে ফেলে। সামনে সোনালি সকাল।
