প্রকৃত শিক্ষা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যে কারণে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩১
শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা শতভাগ বাস্তবায়ন ও বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীর পাঠবিরতি রোধকল্পে সরকার নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ করলেও প্রতিবন্ধকতা দূর হচ্ছে না। অবহেলিত হাওরাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি। শিক্ষা অধিদপ্তরের সুষ্ঠু মনিটরিং ও জবাবদিহিতা না থাকার ফলে ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির দায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শহরের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় ভালো করলেও পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। শহরে হরতাল অবরোধ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বন্ধের দিনে ক্লাস নেওয়া হয়। কিন্তু হাওরাঞ্চলের কোনো কোনো বিদ্যালয়ে নির্ধারিত কর্মদিবসেও বিদ্যালয়ে তালা ঝুলতে দেখা যায়। দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাও বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান না। বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করলেই শিক্ষার মান বাড়ে— এমন ধারণার সঙ্গে শিক্ষাবিদরা একমত নন। তাঁদের মতে, শিক্ষায় কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটি বড় করে দেখা উচিত। বিগত বছরগুলোতে সুশীল সমাজ ও একাধিক শিক্ষক বলেছেন, পাবলিক পরীক্ষায় উদারভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কারণেই শিক্ষার্থীরা বেশি নম্বর পাচ্ছে এবং পাসের হার বাড়ছে। যে কারণে সব বিষয়ে ৮০ শতাংশের ওপরে নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজিতে ফেল করেছে। তবে উদারভাবে খাতা দেখার অভিযোগ সরকারের দায়িত্বশীল মহল বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার গুণগতমান না বেড়ে থাকে তবে আমাদের জন্য বিষয়টি আনন্দের পরিবর্তে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে। তাই শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ণয়ে সরকারের উচিত গবেষণালব্ধ নীতি বাস্তবায়ন করা। সরকার ২০০১ সালে গ্রেডিং সিস্টেম তথা জিপিএ পদ্ধতি চালু করে। ২০০১ সালে এসএসসির ফলাফলে পাসের হার ছিল ৩৯.০৩ শতাংশ আর ২০১৩ সালে পাসের হার ৮৯.০৩ শতাংশ। ২০০১ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৭৬ জন শিক্ষার্থী এবং ২০১৩ সালে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ হাজারের অনেক ওপরে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফল জিপিএ ৫ অর্জনের বাঁধভাঙা আনন্দ-উল্লাসের ফাঁকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে উঁকি দিচ্ছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অভাবই তাদের এই দুশ্চিন্তার মূল কারণ। পাসের হার প্রতি বছর বাড়লেও ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে না। তাই সন্তানের ভালো ফল অর্জনের পর এখন তার মেধার সঠিক পরিচর্যার জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। প্রতি বছরই বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বয় না ঘটার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা অতি ধীর গতিতে হলেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশমান ধারার সঙ্গে দেশবাসীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন প্রজন্ম এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের শিল্প ও প্রযুক্তি নির্ভর কর্মকাণ্ডে যে পরিমাণ দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন তার কিঞ্চিত্ পরিমাণ জোগান আসছে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য থেকে। কারিগরি শিক্ষা জোরদার হলে একদিকে যেমন দেশ সমৃদ্ধশালী হবে আবার অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে সুনাম অর্জন করবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে গড়ে ওঠা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে নিয়মনীতি অনুসরণ না করে একাধিক শাখা খোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নাম পরিবর্তন করে ও ক্ষমতা বাড়িয়ে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের প্রক্রিয়া ঝুলেই রইলো। কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি বাড়িয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণহীন স্বতন্ত্র একটি কমিশন গঠনের যে প্রস্তাব করা হয়েছিল তাতে অনেক বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়। এই প্রস্তাবে কমিশনের চেয়ারম্যানকে পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও পূর্ণকালীন সদস্যদের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির পদমর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন থেকে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের একটি খসড়া আইনের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত খসড়া আইনের প্রস্তাব ভেটিং-এর জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে এবং মতামতের জন্য জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পৃথকভাবে মন্ত্রণালয়দ্বয় তাদের মতামতে বলে যে, উচ্চশিক্ষা কমিশনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আইনে উল্লিখিত কমিশনের পদমর্যাদা, চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগসহ বিভিন্ন ধারা বাদ দিতে বলা হয়। চেয়ারম্যানের বেতনভাতা, পদমর্যাদা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকার নির্ধারণ করবে বলে মতামত জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সরকারের ঐ মন্ত্রণালয়সমূহ যদি উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে তবে এদেশ থেকে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা অসম্ভব। নেত্রকোনা