স্মার্টফোন আর স্মার্ট হাতঘড়ি এখন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি পণ্য। তবে স্মার্ট শব্দটি কেবল এসব ডিভাইসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন টিভি, ফ্রিজ, ওভেন, কফি মেশিন থেকে সবকিছুতেই স্মার্ট প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর গ্যাজেট কিংবা ডিভাইসের বাইরে এসে এখন গোটা শহরটাকেই স্মার্ট করে গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে অনেক দেশেই। এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে প্রথম আলোর মুখ দেখেছে যে শহরটি, তার নাম ‘সংগোডো’। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীর সিউলের ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গড়ে তোলা হয়েছে এই শহর। আধুনিক জীবনযাপনের যাবতীয় সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করেই গড়ে তোলা হয়েছে এই শহরটি।
পরীক্ষামূলকভাবেই একটি প্রযুক্তিনির্ভর শহর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে সংগোডোকে। শহরটাকে যদি একটি শরীর হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে এর ডিএনএ-তেই সংযুক্ত করা রয়েছে প্রযুক্তি। সিউলের লাগোয়া এই শহরটিকে ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শহর হিসেবে মনে করা হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘সিটি-ইন-আ-বক্স’।
বিশেষ কিছু ফিচার
প্রযুক্তিনির্ভর ‘সংগোডো’তে নতুন অনেক ফিচারই যুক্ত করা হয়েছে। যেমন সারা শহর জুড়েই রয়েছে উচ্চগতির ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক। শহরজুড়ে বলতে শহরের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়েতেও রয়েছে এমন উচ্চগতির নেটওয়ার্ক। ফলে পথে চলতে-ফিরতে কোনো জায়গাতেই ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে চিন্তায় পড়তে হবে না এই শহরের বাসিন্দাদের। যেকোনো স্থান থেকেই দেখা যাবে ইন্টারনেটে ভিডিও কিংবা করা যাবে ইমেইল। শুধু তাই নয়, শহরটির রেলওয়ে স্টেশনগুলো থেকে বের হওয়ার পথেই রয়েছে বিশাল বিশাল সব ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে। এসব ডিসপ্লেতে রেলওয়ের সাথে সংযুক্ত বিভিন্ন বাস সার্ভিসের সময়সূচি তো বটেই, কোনো বাস দেরি করছে কি না কিংবা কতক্ষণের মধ্যে একটি বাস এসে দাঁড়াবে—এর সব তথ্যই পাওয়া যাবে। এর বাইরে স্যামসাংয়ের মতো সব টেক জায়ান্টরা কাজ করে যাচ্ছে এই শহরের যাবতীয় বাসা-বাড়ির ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত করতে। এর বাইরে শহরজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর। এসব সেন্সর সার্বক্ষণিক শহরের তাপমাত্রা, শক্তির খরচ কিংবা ট্রাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে। ফলে কোনো জায়গায় যাওয়ার সময় আপনাকে রাস্তায় দেরি করতে হবে কি না, সেই তথ্য আগেই জেনে নিতে পারবেন। কিংবা কোথাও যাওয়ার জন্য বিকল্প রাস্তার খোঁজও পাবেন। আবার আপনার স্থানে কোনো ধরনের সমস্যা থাকলে তার কথাও কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হবে তাত্ক্ষণিকভাবে।
ডিজিটাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
সংগোডোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও ডিজিটাইজ করা হয়েছে। আর দৈনন্দিন জীবনযাপনের অন্যান্য প্রক্রিয়াকেও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যাায় এই শহরের পানি ব্যবস্থাপনার কথা। এখানে এমন এক ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে যাতে করে বিশুদ্ধ পানীয় জল কেউ গোসল করা বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার না করতে পারে। আবার বর্জ্য সংগ্রহের জন্য অন্যান্য শহরের মতো এখানে ডাস্টবিন নেই। বরং প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরগুলোর নিচ দিয়ে চলে গেছে বিশেষ ধরনের টানেল। আর এসব টানেল শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিলিত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট স্থানে। এখানেই সব বর্জ্য জমা হয়। সেখানেই এসব বর্জ্যকে রিসাইকেল করা হয়। অদূর ভবিষ্যতেই অবশ্য এসব বর্জ্যের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি উত্পাদনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে এই স্মার্ট শহর গড়ে তোলার প্রকল্প। ইতোমধ্যেই শহরটি বসবাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। এখনও পর্যন্ত শহরের অর্ধেকই ফাঁকা রয়েছে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোর সিংহভাগই রয়েছে ফাঁকা। ফলে শহরে ঢুকলে অনেকটাই ফাঁকা মনে হয়। তবে ২০১৫ সাল নাগাদ শহরটি জমজমাট হয়ে উঠবে বলেই আশা করছে শহরটির কর্তৃপক্ষ।
