বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বরগুনার পায়রা (বুড়িশ্বর)-বিষখালী-বলেশ্বর নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জেলার প্রায় অর্ধশত গ্রামসহ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী বাজার। ভেঙে যাচ্ছে তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত বেড়িবাঁধ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অতি জোয়ারের পানি একটু সুযোগ পেলেই প্লাবিত করে দেয় গ্রামাঞ্চল। অসহায় হয়ে পড়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ জেলার লাখ লাখ মানুষ। দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার ও ভাঙ্গনরোধ করতে না পারলে অসংখ্য প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নদীর পাড়ে বসবাসরত মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন জোয়ারের সময় নদীর তুফানে (পানির ঢেউতে) ভেঙ্গে যায় ঘর-বাড়ি, ভেড়িবাঁধসহ ফসলের মাঠ; কিন্তু ভাঙ্গন রোধ অথবা বেড়িবাঁধ রক্ষায় কর্তৃপক্ষের কোন কার্যক্রম নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে উপকূলের মানুষ। অনেকের ঘর-বাড়ি নদী গর্ভে চলে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে। কেউ কেউ ফসলের মাঠ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো হচ্ছে- সদর উপজেলার বুড়িরচর, গোলবুনিয়া, চালিতাতলী, লতাকাটা, পালের বালিয়াতলী, নিশানবাড়িয়া, নলী, ডালভাঙ্গা, গুলিশাখালী। বেতাগী উপজেলার সড়িষামুড়ী, ঝোপখালী, বামনা উপজেলা শহর, বামনা। পাথরঘাটার কালমেঘা, পদ্মা, রুহিতা, জ্বীনতলা, কাকচিড়া। আমতলীর চাওড়া, বালিয়াতলী ও তালতলী উপজেলার ছোটবগী, মৌপাড়া, বড়বগী, জয়ালভাঙ্গা, তেঁতুলবাড়িয়া।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার ২২ পোল্ডারে ২৪ কিলোমিটার বাঁধ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে ১৭৫ কিলোমিটার। বরগুনা জেলায় মোট সাড়ে নয়শ’ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে।
তালতলী উপজেলার মৌপাড়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, “অন্তত ৭ একর জমিতে বাপ-দাদার বাড়ি ছিল। ১০/১২ একর ছিল ফসলের মাঠ। নদীতে ভাঙতে ভাঙতে সব শ্যাষ (শেষ) হইয়া গ্যাছে। এহোন (এখন) নিজেদের থাকার জায়গা নাই।
আমতলী উপজেলার আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, পায়রা নদীর ভাঙনে এ পর্যন্ত বালিয়াতলী গ্রামের শত শত ঘর-বাড়ি নদীতে চলে গেছে।
লোহাগড়ার বাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত
লোহাগড়া ( নড়াইল ) সংবাদদাতা জানান, নড়াইলের লোহাগড়ার মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ঘরবাড়ি, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কোটাকোল ইউনিয়নের ঘাঘা পয়েন্টে ওয়াপদার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এ বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা না নেয়ায় প্ল¬¬াবিত হচ্ছে আরো নতুন নতুন এলাকা। অব্যাহত নদী ভাঙ্গনের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। মানবেতর জীবন-যাপন করছে তারা।
মধুমতি নদীর মঙ্গলহাটা পয়েন্টে স্রোতের গতি কমানোর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত ৭টি স্পারের মধ্যে ৪টি ভেঙ্গে যাওয়ায় মঙ্গলহাটা, নওয়াগ্রামসহ তিনটি পয়েন্ট হুমকির মধ্যে রয়েছে। গত এক সপ্তাহের ভাঙ্গনে উপজেলার শালনগর ইউনিয়নের শিয়েরবর বাজারের প্রায় অর্ধেক, বাড়িঘর, প্রাইমারী স্কুল, মাকড়াইল-কাশিপুর, রামকান্তপুর গ্রাম, জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা, ধানাইড়, লোহাগড়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া, মল্লি¬¬কপুর ইউনিয়নের মঙ্গলহাটা, মহিষাপাড়া, চরকরফা, কোটাকোল ইউনিয়নের ঘাঁঘা, ধলইতলা, ইতনা ইউনিয়নের লংকারচর, ডিগ্রীর চর, পাংখারচরসহ উপজেলার অনেক এলাকার রোপা আমনসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আলী হাওলাদার জানান, প্রবল পানির চাপে বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙ্গন প্রতিরোধে বাজেট বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি দেয়া হয়েছে।
মাওয়ার পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙ্গন
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মার ভাঙ্গন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া ভাঙ্গনে ইতোমধ্যেই অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘর ও দোকান-পাট, মসজিদ ও একটি মাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ১৩৪ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিঃস্ব পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে মঙ্গলবার ১০ হাজার করে টাকা এবং ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো.সাইফুল হাসান বাদল মঙ্গলবার দুপুরে ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে এই বরাদ্দ ঘোষণা করেছেন।
সোমবার বিকালে অর্ধশতাধিক লোক নিয়ে মাওয়া পুরনো ফেরিঘাটের এক বিঘা জায়গা আকস্মিক পদ্মায় তলিয়ে গেছে। এক নারী, দুই শিশু ও এক ব্যক্তিসহ বেশ ক’জন তীরে উঠলেও ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। তবে মাওয়া ফাঁড়ি পুলিশ ইনচার্জ এসআই হাফিজুল ইসলাম জানান, হঠাত্ লোকজনসহ অনেকটা এলাকা পদ্মায় তলিয়ে গেছে। তবে নিখোঁজ রয়েছে এমন কারো পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি।
এদিকে মঙ্গলবার মাওয়ায় ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় লাল ফিতা দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। মাইকিং করা হচ্ছে। যাতে এই ফিতা কেউ অতিক্রম না করে।
দিন-রাত মাওয়া পুরোনো ৩নং ফেরিঘাট এলাকার নদী তীরের দোকান ও বসতি ঘর সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ক্রমশই পদ্মা গ্রাস করছে জনপদ। এ পর্যন্ত ২শ’ দোকান ও ঘর সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
