সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আরেকবার সুযোগ দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠে উপজেলা আওয়ামী লীগ কর্তৃৃক আয়োজিত বিশাল সমপ্রীতি সমাবেশে এ আহ্বান জানান তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আরেকবার সেবা করার সুযোগ দিন। যাতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসাবে বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কবি অধ্যাপক আদিল উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যে মুশল ধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমাকে দেখার জন্য মাঠে অপেক্ষা করছেন, তার জন্য আপনাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের এই ভালবাসা চিরদিন মনে থাকবে। রিক্ত আমি সিক্ত আমি, দেয়ার কিছু নাই। আছে শুধু ভালবাসা দিয়ে গেলাম তাই। তিনি বলেন, গত নির্বাচনে আপনারা ভোট দিয়ে আব্দুর রহমান বদিকে নির্বাচিত করেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সাড়ে ৪ বছরে এ এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আগামীতেও এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী দুঃখ করে বলেন, গত ২৯ মে রামু, উখিয়ায় যে তাণ্ডব হয়েছে তা কোনদিনও ভুলার নয়। তারা বৌদ্ধ মন্দির ভাংচুর করে ক্ষান্ত হয়নি, বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা চালিয়ে বাড়ি-ঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই, ঐ সময় যারা রুখে দাঁড়িয়েছিল, যাদের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হয়নি। হেফাজতকে উদ্দেশ্য করে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলেন, এদেশের সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করছে। লাকুম দ্বীনিকুম অল ইয়া দ্বীন, অর্থাত্ যে যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার সুযোগ পাবেন। নবী করিম (সঃ) মানুষকে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন। অথচ আজ কিছু কিছু ধর্মীয় লেবাসধারী ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে আঘাত করছে। তারা ১১টি বৌদ্ধ মন্দির আংশিক ও ১২টি বৌদ্ধ মন্দির সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে বিদেশের কাছে দেশকে ছোট করেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঐসব বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেছে। বিজিবি’র সদস্যরা বৌদ্ধ পল্লীগুলো নির্মাণ করেছে। এতে অসামপ্রদায়িকতার ধারা ফিরে এসেছে ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমাদের সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আর বিএনপি ক্ষমতায় আসলে লুটপাট চালিয়ে আবার খাদ্য ঘাটতি করে। আমাদের লক্ষ্য সর্বদলীয় রাষ্ট্র হিসেবে উন্নীত করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠন করা। আপনারা জানেন, গত রমযান মাসে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকায় না খেয়ে কেউ কষ্ট পায়নি। ১৯৯৬ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে, তখন ব্যয় বহুল হওয়ার কারণে অনেকেই মোবাইল ব্যবহার করার সুযোগ পায়নি। অথচ আমরা ক্ষমতায় এসে সকলের হাতে হাতে মোবাইল পৌঁছে দিয়েছি। তারা বিদেশে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সহজে কথা বলতে পারছেন। এতে দেশের উন্নয়ন হয়েছে। তাছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্য সেবা কেন্দ চালু করে ঘরে ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছি। ছেলে ঘরে বসেই কলেজে ভর্তির আবেদন করছে, চাকরির দরখাস্ত করতে সুযোগ পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার মিয়ানমারের সাথে আইনি লড়াই করে সমুদ্র জয় করতে সক্ষম হয়েছে। আগামীবার ক্ষমতায় আসলেই ভারতের সাথে সমুদ্র নিয়ে যে বিরোধ চলছে তাতেও আমরা জয়ী হবো।
কক্সবাজার প্রতিনিধি আহমদ গিয়াস ও উখিয়া সংবাদদাতা রফিকউদ্দিন বাবুল জানান: দেশে চলমান জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি, জামায়াতের ছত্রছায়ায় এদেশের জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা ঐ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে বিরোধীদল মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা গত সাড়ে ৪ বছরে এদেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান অনেক উন্নয়ন করেছি। আমাদের লক্ষ্য দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা।
দেশকে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বিনা পয়সায় ২৭ কোটি বই বিতরণ করেছি। মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে। ৭৮ লাখ ছাত্রীকে উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। আলাদা শিক্ষাট্রাস্ট গঠন করে তার মাধ্যমে ১ লাখ ৩১ হাজার ছাত্রীকে উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। বাবা-মাকে আর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচের জন্য ভাবতে হবে না। সরকার যাবতীয় খরচ বহন করে বাংলাদেশকে শিক্ষায় উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, রামু, উখিয়ার বৌদ্ধ পল্লীতে তাণ্ডবলীলা চালিয়েও তারা ক্ষান্ত হয়নি। গত মে মাসে বিরোধীদলের নেত্রীকে সংলাপের আহ্বান জানানো হলে, খালেদা জিয়া ঐ সংলাপে সাড়া না দিয়ে আমাকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। তাদের চক্রান্তে হেফাজতের হুজুরেরা ঢাকা ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা করেন। আমরা তাদের শান্তিপূর্ণভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা বললে ঐ রাতেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে বায়তুল মোকাররম মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, তারা যেভাবে শত শত পবিত্র কোরআন শরীফ পুড়িয়ে দিলেন তা একজন মুসলমানের পক্ষে কোনদিনও সম্ভব নয়। তারা কোরআন পুড়িয়ে ইসলাম ধর্মের উপর আঘাত হেনেছে। ধর্মের কথা বলে মসজিদে আগুন দিয়েছে। অথচ হেফাজতের হুজুরেরা মেয়েদের স্কুলে যেতে নিষেধ করলেন। আরও বললেন মেয়ে দেখলে নাকি তাদের জিহ্বায় পানি আসে। এইকি তাদের ইসলাম। তিনি বলেন, বিবি খাদিজা (রাঃ) প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ধর্মে নারীদের ধর্ম করার অধিকার দিয়েছে। শিক্ষানীতিমালায় ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামী ফাউন্ডেশন করে আলেম-উলামাদের মূল্যায়ন করেছে। সভায় বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহামুদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন, বীর বাহাদুর এমপি ও উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ছিলেন।
শ্রেষ্ঠ সম্প্রীতির দেশ করার অঙ্গীকার
দর্পণ বড়ুয়া, রামু (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, রামুতে নবনির্মিত ১২টি বৌদ্ধ বিহার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ সরকার, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি সুরক্ষায় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ শান্তি সমপ্রীতির দেশে পরিণত করবে। এই সরকারের আমলে সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করছে। তিনি বলেন, রামুর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার নির্মাণে সেনাবাহিনী শুধু দায়িত্ব পালন করেনি, তারা তাদের কর্মদক্ষতারও প্রমাণ রেখেছে। তিনি দৃষ্টিনন্দন এই বিহারগুলো পরিদর্শন করে পর্যটকরা যাতে নিরাপদে রাত্রি যাপন করতে পারে, সেজন্য রামুকে আন্তর্জাতিক পর্যটন এলাকায় পরিণত করা হবে। বেলা ১২টায় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারযোগে রামু পৌঁছে প্রথমে রামু উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রসহ নবনির্মিত বৌদ্ধ বিহারগুলো উদ্বোধন করেন। এসময় তার সাথে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এমপি, আমেরিকান রাষ্টদূত ড্যান মজীনা, ভারতের রাষ্টদূত পঙ্কজ শরণ, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ও বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশের কুটনৈতিকগণ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, নৌ বাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ ফরিদ হাবিব, ১৭ ইসিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জুলফিকার রহমান, জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ সত্য প্রিয় মহাথেরা, ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ করুনাশ্রী থের, রামু উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল, মহাজোট মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সোনালী ব্যাংক পরিচালক সাইমুম সরওয়ার কমল, বৌদ্ধ নেতা নীতিশ বড়ুয়া ও পলক বড়ুয়া।
তারপর রামু মৈত্রী বিহার কমপ্লেক্স লালচিং বিহার, সাদাচিং বিহার, আর্যবংশ বৌদ্ধ বিহার, অপর্ণা চরণ বৌদ্ধ বিহার, উচাই সেন বিহার পরিদর্শনে যান। সেখান থেকে রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারে গিয়ে বৌদ্ধদের পক্ষ থেকে আয়োজিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অনুষ্ঠানে সুধীজনদের সাথে মতবিনিময় করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে রামু বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের পক্ষে শুভেচ্ছা নিদর্শন হিসেবে ক্রেস্ট উপহার দেন সত্যপ্রিয় মহাথেরা। উপস্থিত ছিলেন ধর্মসেন মহাথেরা, তরুণ বড়ুয়া ও অলক বড়ুয়া।
