প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধান সম্মত, তবে বাস্তবধর্মী নয়

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৯
সংসদ বহাল রেখেই আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানকে ‘সম্পূর্ণভাবে সংবিধান সম্মত’ বলেই মত দিয়েছেন দেশের কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞ। তবে পাশাপাশি তারা এটিও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বা অবস্থান দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সহায়ক নয়, অর্থাত্ সরকারের এই অবস্থান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত সোমবার সচিবালয়ে সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চলতি নবম জাতীয় সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ঐ ৯০ দিনে সংসদের কোনো অধিবেশন বসবে না। ঐ সময়ে ছোট একটি মন্ত্রিসভা থাকবে, তবে মন্ত্রিসভা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না, শুধু দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’ প্রসঙ্গত, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১২৩-এ বলা আছে, ‘(৩) সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যেঃ তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলসহ নানা অঙ্গনে নতুন করে বহুমুখী আলোচনা-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধান সম্মত কিনা, তা নিয়েও কারও কারও প্রশ্ন রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা কমিটির আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, সরকার ও বিরোধী দলসহ যেসব দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তাদের সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় সংলাপ হওয়া জরুরি। সেই সংলাপেই এসব প্রশ্ন কিংবা বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত। অন্যথায় চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে একতরফা নির্বাচন হতে পারে না। সংলাপ এড়িয়ে শুধু সংবিধানের দোহাই দিয়ে কিছু করা হলে তাতে শান্তি আসবে না। কেননা দেশের জনগণ সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। সরকার সংলাপ ডাকুক, সেখানে তারা তাদের যুক্তি দেখাবে, যারা নির্দলীয় সরকার দাবি করছে তারা তাদের যুক্তি তুলে ধরবে। এভাবেই বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে হবে। তা না হলে সংকট আরো বাড়বে। এদিকে সংসদ সদস্য পদ ‘লাভজনক’ নাকি ‘অলাভজনক’- এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। এ ব্যাপারে দেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ইতোপূর্বে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, “বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এমপিদের পদ লাভজনক নয়। বিচারপতি এম. রশীদও একটি রায়ে বলেছিলেন, ‘দে (সংসদ সদস্যরা) আর নট পাবলিক সার্ভেন্ট।’ অবশ্য একথা ঠিক যে, যেহেতু সংসদ সদস্যদের পদ ‘লাভজনক’ কি ‘অলাভজনক’ তা সংবিধানে স্পষ্ট করা হয়নি, সেজন্য নির্বাচনের সময় এ নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।” এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্্দীন মালিক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, “যেহেতু সংসদ সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, সে কারণে সংবিধান অনুযায়ীই তাদের পদ ‘লাভজনক’ নয়। লাভজনক পদ হতে হলে তাকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হতে হবে, এবং তার নিয়োগ, বদলি কিংবা বরখাস্তের ক্ষমতা থাকতে হবে সরকারের হাতে। এছাড়া লাভজনক পদের সংজ্ঞা অনুযায়ী এই পদের কিছু নির্বাহী ক্ষমতা থাকতে হবে, তার বেতন-ভাতাও হতে হবে সরকারের কোষাগার থেকে। কিন্তু এমপিদের ক্ষেত্রে এমন কোনো কিছু করার ক্ষমতাই সরকারের নেই, এমপিদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতাও নেই। সে কারণে তাদের পদ লাভজনক নয়।” তিনি বলেন, “তবে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রীদের নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রী, তিনি তাদের বাদও দিতে পারেন, তাদের প্রত্যেকের নির্বাহী ক্ষমতাও রয়েছে, এমনকি তাদের বেতন-ভাতাও হয় সরকারি কোষাগার থেকে। এজন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীদের পদ ‘লাভজনক’। কিন্তু যেহেতু সংবিধানে তাদের পদকে ‘লাভজনক নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সে কারণে তাদেরও স্ব-পদে বহাল থেকে নির্বাচন করতে কোনো আইনি কিংবা সাংবিধানিক বাধা নেই।” প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে ‘সংবিধান সম্মত’ উল্লেখ করে ড. শাহ্্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন সেটির সঙ্গে সংবিধানের কোনো সমস্যা নেই। সংবিধান অনুযায়ীই সংসদসহ সবকিছু বহাল রেখে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। তবে সংবিধানে নির্বাচনের বিষয়ে দুটি বিকল্প বলা হয়েছে, প্রথমত: সংসদ বহাল রেখে, দ্বিতীয়ত: সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের যে বিকল্প রাখা হয়েছে, আমার ধারণা এটা রাখা হয়েছে বিশেষ, আপদকালীন কিংবা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায়। যেমন নির্বাচনের সময় যদি যুদ্ধাবস্থা কিংবা বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তখন যেন জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে অধিবেশন ডাকা যায়, সে বিবেচনায়ই সংসদ বহাল রাখার কথা বলা আছে। তবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হওয়া সমীচীন নয়। তেমনটি হলে নির্বাচন হবে অসম। সেটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না। শাহ্্দীন মলিক বলেন, যেহেতু প্রধানমন্ত্রীসহ তার মন্ত্রিসভা ও এমপিরা নির্বাচনের সময় স্বপদে বহাল থাকবেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সবার জন্য সমতল মাঠ থাকবে না, সে কারণে এ ব্যবস্থায় বিরোধী দল নির্বাচনে যেতে পারে না। ফলে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে গেলে জটিলতা বৃদ্ধি পাবে, এতে সন্দেহ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে শাহ্্দীন মালিক বলেন, কোনো সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয় না। ভারত, ইংল্যান্ডেও সংসদ ভেঙ্গেই নির্বাচন হয়। নির্বাচনের সময় ভারতে রাষ্ট্রপতি একটি ছোট মন্ত্রিসভা পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। বিশিষ্ট এই আইনজ্ঞের মতে, তারপরেও যেসব দেশে গণতন্ত্র পরিপূর্ণতা পেয়েছে, সেসব স্থানে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা যেতে পারে। কারণ সেখানে বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনসহ জাতীয় বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী থাকে, সেখানে দলীয়করণ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। দেশের আরেকজন জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংবিধানেই বাইরে কিছু বলেননি। নির্বাচনের সময় মন্ত্রিসভা কি সিদ্ধান্ত নেবে, না নেবে —সেটি একেবারেই প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রিসভার ওপর নির্ভর করবে। মন্ত্রিসভা যদি মনে করে মেয়াদের শেষ তিন মাসে তারা নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না, সেটি একেবারেই তাদের বিষয়। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই আইনজ্ঞের মতে, সংসদ সদস্যরা স্ব-পদে বহাল থেকেই নির্বাচন করতে পারবেন, কারণ সংবিধান তাকে সেই অধিকার দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এমপিদের স্বপদে বহাল থেকে নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সংবিধানের অন্য কোনো অনুচ্ছেদ কিংবা আরপিও’র কোনো বিধি-বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে তার জানা নেই।